বিষয়ের ভূমিকা

জীবজগতের সর্বাপেক্ষা মৌলিক ও বিস্ময়কর উপাদান হলো কোষ (Cell)। পৃথিবীর সমস্ত জীব—ছোট্ট একটি ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে প্রকাণ্ড নীল তিমি বা বিশাল বটবৃক্ষ—সবই এক বা একাধিক কোষ দিয়ে গঠিত। এই কারণেই কোষকে বলা হয় 'জীবনের গঠনগত ও কার্যগত একক' (Fundamental Structural and Functional Unit of Life)। NCERT একাদশ শ্রেণির জীববিদ্যা পাঠ্যক্রমের অষ্টম অধ্যায় 'কোষ: জীবনের একক' (Cell: The Unit of Life) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এটি কেবল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার জন্যই নয়, বরং NEET-এর মতো জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্যও সমান তাৎপর্যপূর্ণ।

আমরা যখন আমাদের চারপাশের জগতকে পর্যবেক্ষণ করি, তখন জীব ও অজৈব পদার্থের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো কোষের উপস্থিতি। কোনো সত্তা যদি স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষা করতে চায় এবং জীবনের মৌলিক কার্যাবলী সম্পন্ন করতে চায়, তবে তার ন্যূনতম কোষীয় সংগঠন থাকা আবশ্যক। এই অধ্যায়ে আমরা কোষ তত্ত্ব, কোষের প্রকারভেদ, কোষের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাণু এবং তাদের কাজের কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত ও প্রাঞ্জল ভাষায় আলোচনা করব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. কোষ আবিষ্কার ও কোষ তত্ত্ব (Cell Theory)

কোষ আবিষ্কারের ইতিহাস অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী রবার্ট হুক (Robert Hooke) প্রথম অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে কাষ্ঠল কর্কের পাতলা ছেদ পরীক্ষা করে মৌমাছির চাকের মতো কিছু ফাঁপা প্রকোষ্ঠ দেখতে পান এবং এগুলির নাম দেন 'সেল' (Cell)। তবে হুক যা দেখেছিলেন তা ছিল মৃত কোষের প্রাচীর। পরবর্তীতে ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে ডাচ বিজ্ঞানী অ্যান্টনি ভন লিউয়েনহুক (Anton van Leeuwenhoek) প্রথম উন্নত অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে জীবিত কোষ (যেমন ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া, শুক্রাণু) পর্যবেক্ষণ করেন।

উন্নয়নশীল অনুবীক্ষণ যন্ত্রের অগ্রগতির সাথে সাথে কোষের ভেতরের গঠন স্পষ্ট হতে থাকে। ১৮৩১ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট ব্রাউন (Robert Brown) কোষের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গাণু নিউক্লিয়াস (Nucleus) আবিষ্কার করেন।

কোষ তত্ত্বের বিকাশ:

  • ১৮৩৮ সালে জার্মান উদ্ভিদবিজ্ঞানী ম্যাথিয়াস শ্লাইডেন (Matthias Schleiden) বিভিন্ন উদ্ভিদ পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে আসেন যে, সমস্ত উদ্ভিদ বিভিন্ন প্রকার কোষ দ্বারা গঠিত।
  • ১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ প্রাণিবিজ্ঞানী থিওডোর শোয়ান (Theodore Schwann) প্রাণী কোষ অধ্যয়ন করে দেখেন যে প্রাণী কোষের বাইরে একটি পাতলা আবরণ রয়েছে, যা আজ 'কোষ পর্দা' নামে পরিচিত। তিনি আরও প্রস্তাব করেন যে উদ্ভিদ কোষের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো কোষ প্রাচীরের উপস্থিতি।
  • শ্লাইডেন ও শোয়ান যৌথভাবে কোষ তত্ত্ব (Cell Theory) প্রণয়ন করেন। তবে এই তত্ত্বের একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল—এটি ব্যাখ্যা করতে পারেনি যে নতুন কোষ কীভাবে গঠিত হয়।
  • ১৮৫৫ সালে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী রুডলফ ভার্চাও (Rudolf Virchow) প্রথম এই ধারণার পরিমার্জন ঘটান। তিনি তাঁর বিখ্যাত লাতিন উক্তি উত্থাপন করেন: "Omnis cellula-e cellula", যার অর্থ হলো—'পূর্ববর্তী কোষ থেকেই নতুন কোষের সৃষ্টি হয়'।

বর্তমান যুগে আধুনিক কোষ তত্ত্বের প্রধান দুটি মূলনীতি হলো:

  • ১. সমস্ত জীব এক বা একাধিক কোষ এবং কোষজাত পদার্থ দ্বারা গঠিত।
  • ২. সমস্ত কোষের উৎপত্তি পূর্বে বিদ্যমান কোষ বিভাজনের মাধ্যমেই ঘটে।

২. কোষের বৈচিত্র্য ও প্রকারভেদ

কোষের আকার, আকৃতি এবং কাজের মধ্যে প্রচুর বৈচিত্র্য দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ক্ষুদ্রতম কোষ হলো মাইকোপ্লাজমা (Mycoplasma), যার দৈর্ঘ্য মাত্র ০.৩ মাইক্রোমিটার ($\begin{equation}\frac{1}{1000} \text{ mm} \times 0.3 ight.$)। অন্যদিকে, সবচেয়ে বড় একক কোষ হলো উটপাখির ডিম। মানবদেহের লোহিত রক্তকণিকার (RBC) ব্যাস প্রায় ৭.০ মাইক্রোমিটার, আবার স্নায়ুকোষ (Neuron) হলো মানবদেহের অন্যতম দীর্ঘতম কোষ।

আণুবীক্ষণিক গঠন এবং সুসংগঠিত নিউক্লিয়াসের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে জীবকোষকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:

  • ১. প্রোক্যারিওটিক কোষ (Prokaryotic Cell): আদিম বা সুগঠিত নিউক্লিয়াসবিহীন কোষ।
  • ২. ইউক্যারিওটিক কোষ (Eukaryotic Cell): আধুনিক ও সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত কোষ।

৩. প্রোক্যারিওটিক কোষ (Prokaryotic Cells)

প্রোক্যারিওটিক কোষ প্রধানত ব্যাকটেরিয়া, নীল-সবুজ শৈবাল (Cyanobacteria), মাইকোপ্লাজমা এবং PPLO (Pleuro Pneumonia Like Organisms)-তে পাওয়া যায়। এগুলি ইউক্যারিওটিক কোষের তুলনায় অনেক ছোট এবং খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে।

প্রোক্যারিওটিক কোষের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • আকার ও আকৃতি: ব্যাকটেরিয়ার প্রধান চারটি আকার থাকে—কক্কাস (গোল গোল), ব্যাসিলাস (দণ্ডাকার), ভাইব্রিও (কমা চিহ্নিত) এবং স্পাইরিলাম (পেঁচানো)।
  • কোষীয় আবরণী (Cell Envelope): এটি একটি জটিল ত্রি-স্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একদম বাইরের স্তরটি হলো গ্লাইকোক্যালিক্স (Glycocalyx) (যা শক্ত হলে ক্যাপসুল এবং শিথিল হলে স্লাইম স্তর গঠন করে), মধ্যবর্তী স্তর হলো কোষ প্রাচীর (Cell Wall) এবং ভেতরের স্তর হলো কোষ পর্দা (Plasma Membrane)
  • জিনোমিক ডিএনএ ও প্লাজমিড: এদের নির্দিষ্ট নিউক্লিয়ার পর্দা থাকে না। পেঁচানো বৃত্তাকার প্রধান ডিএনএ অনুকে নুয়েক্লিওয়েড (Nucleoid) বলা হয়। এছাড়াও অনেক ব্যাকটেরিয়ায় প্রধান ডিএনএ-র বাইরে ছোট ছোট বৃত্তাকার ডিএনএ থাকে, যাদের প্লাজমিড (Plasmid) বলে। এটি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের মতো অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করে।
  • মেসোজোম (Mesosome): প্লাজমা পর্দা ভেতরের দিকে ভাজ হয়ে এই বিশেষ গঠন তৈরি করে। এটি শ্বসন, ডিএনএ প্রতিলিপিকরণ এবং কোষ প্রাচীর গঠনে সাহায্য করে।
  • রাইবোজোম: প্রোক্যারিওটিক কোষে 70S রাইবোজোম (50S ও 30S উপ-একক নিয়ে গঠিত) থাকে, যা প্রোটিন সংশ্লেষে অংশ নেয়।

৪. ইউক্যারিওটিক কোষ (Eukaryotic Cells)

ইউক্যারিওটিক কোষ দেখা যায় প্রোটিস্ট, ছত্রাক, উদ্ভিদ এবং প্রাণীরাজ্যে। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নিউক্লিয়ার পর্দা দ্বারা আবৃত একটি সুসংগঠিত নিউক্লিয়াস এবং ঝিল্লিবেষ্টিত অভ্যন্তরীণ অঙ্গাণুর উপস্থিতি।

উদ্ভিদ ও প্রাণী কোষের প্রধান পার্থক্য:

  • উদ্ভিদ কোষে কোষ প্রাচীর, প্লাস্টিড এবং একটি বিশাল কেন্দ্রীয় রসস্ফীত ভ্যাকুওল থাকে, যা প্রাণী কোষে অনুপস্থিত।
  • প্রাণী কোষে সেন্ট্রিওল বা সেন্ট্রোসোম থাকে যা কোষ বিভাজনে সাহায্য করে, যা সাধারণ উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদ কোষে থাকে না।

৫. কোষীয় আবরণী: প্লাজমা পর্দা ও কোষ প্রাচীর

কোষ পর্দা (Cell Membrane):

১৯৭২ সালে বিজ্ঞানী সিঙ্গার এবং নিকলসন (S.J. Singer and G.L. Nicolson) কোষ পর্দার সর্বজনগ্রাহ্য 'ফ্লুইড মোজাইক মডেল' (Fluid Mosaic Model) প্রস্তাব করেন। এই মডেল অনুযায়ী:

  • কোষ পর্দা একটি দ্বি-স্তরীয় লিপিড (Phospholipid bilayer) দ্বারা গঠিত। লিপিডের হাইড্রোফিলিক (জলরাগী) মেরু অংশ বাইরের দিকে এবং হাইড্রোফোবিক (জলবিদ্বেষী) পুচ্ছ অংশ ভেতরের দিকে থাকে।
  • লিপিড স্তরের মধ্যে বিভিন্ন প্রোটিন মোজাইকের মতো ভাসমান অবস্থায় থাকে। প্রোটিন দুই প্রকার: প্রান্তীয় প্রোটিন (Peripheral protein) এবং সমন্বিত প্রোটিন (Integral protein)।
  • কোষ পর্দার প্রধান কাজ হলো এটি একটি প্রভেদক ভেদ্য পর্দা (Selectively Permeable Membrane) হিসেবে কাজ করে পদার্থের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে।

কোষ প্রাচীর (Cell Wall):

উদ্ভিদ, ছত্রাক ও অ্যালগির প্লাজমা পর্দার বাইরে অবস্থিত শক্ত, অজীব স্তরকে কোষ প্রাচীর বলে। উদ্ভিদের কোষ প্রাচীর সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ, পেকটিন এবং প্রোটিন দ্বারা গঠিত। পাশাপাশি দুটি কোষের প্রাচীরকে যুক্ত রাখে মধ্য ল্যামেলা (Middle Lamella) যা মূলত ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম পেকটেট দিয়ে তৈরি। দুটি প্রতিবেশী কোষের সাইটোপ্লাজমকে যুক্ত রাখার সূক্ষ্ম নালীকে প্লাজমোডেজমাটা (Plasmodesmata) বলে।

৬. এন্ডোমেমব্রেন সিস্টেম (Endomembrane System)

কোষের এমন কিছু অঙ্গাণু রয়েছে যাদের কাজ একে অপরের সাথে সুসংবদ্ধভাবে যুক্ত। এদের একত্রে এন্ডোমেমব্রেন সিস্টেম বলে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলো: এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা, গলগি বস্তু, লাইসোজোম এবং ভ্যাকুওল। (নোট: মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্ট এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত নয়)।

  • এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা (Endoplasmic Reticulum - ER): সাইটোপ্লাজমে ছড়ানো নালিকাকৃতি গঠন। এর গায়ে রাইবোজোম যুক্ত থাকলে তাকে মসৃণ নয় বা খসখসে ER (Rough ER) বলে, যা প্রোটিন সংশ্লেষে যুক্ত। রাইবোজোম না থাকলে তাকে মসৃণ ER (Smooth ER) বলে, যা লিপিড ও স্টেরয়েড সংশ্লেষ করে।
  • গলগি বডি (Golgi Apparatus): ১৮৯৮ সালে ক্যামিলো গলগি এটি আবিষ্কার করেন। চ্যাপ্টা সিস্টারনি নিয়ে গঠিত এই অঙ্গাণু ER থেকে প্রাপ্ত উপাদানকে রূপান্তরিত, প্যাকেটজাত (Packaging) এবং কোষের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণে সাহায্য করে।
  • লাইসোজোম (Lysosome): হাইড্রোলাইটিক পাচক উৎসেচক (যেমন লাইপেজ, প্রোটিয়েজ, কার্বোহাইড্রেজ) পূর্ণ একক পর্দাঘেরা থলি। কোষীয় বর্জ্য বিনষ্ট করার জন্য এদের 'আত্মঘাতী থলি' (Suicidal Bag) বলা হয়।
  • ভ্যাকুওল (Vacuole): উদ্ভিদ কোষের আয়তনের প্রায় ৯০% স্থান দখল করতে পারে এই ভ্যাকুওল। এর চারপাশের পর্দাকে টোনোপ্লাস্ট (Tonoplast) বলা হয়, যা ঘনত্বের পার্থক্যের বিপরীতে আয়ন পরিবহনে সাহায্য করে।

৭. শক্তি রূপান্তরকারী অঙ্গাণু: মাইটোকন্ড্রিয়া ও প্লাস্টিড

মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondrion):

কোষের শক্তিঘর (Powerhouse of the Cell) নামে পরিচিত। দ্বি-স্তরীয় পর্দাযুক্ত এই অঙ্গাণুর ভেতরের পর্দাটি ভেতরের দিকে ভাজ হয়ে আঙুলের মতো গঠন তৈরি করে, যাকে ক্রিস্টি (Cristae) বলে। ক্রিস্টি কোষীয় শ্বসনের পৃষ্ঠতল বৃদ্ধি করে। মাইটোকন্ড্রিয়ার নিজস্ব বৃত্তাকার ডিএনএ এবং 70S রাইবোজোম থাকে, তাই এরা স্বসংস্থানকারী (Semi-autonomous) অঙ্গাণু।

প্লাস্টিড (Plastid):

শুধুমাত্র উদ্ভিদকোষ ও ইউগ্লিনয়েডে পাওয়া যায়। রঞ্জকের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্লাস্টিড তিন প্রকার:

  • ক্লোরোপ্লাস্ট (Chloroplast): ক্লোরোফিল সমৃদ্ধ সবুজ প্লাস্টিড, যা সালোকসংশ্লেষ ঘটায়। এর ভেতরে থাইলাকয়েড থলি স্ট্যাক বা গাদা আকারে সাজানো থাকে যা গ্রানা (Grana) গঠন করে। ম্যাট্রিক্স অংশকে স্ট্রোমা (Stroma) বলে।
  • ক্রোমোপ্লাস্ট (Chromoplast): ক্যারোটিন ও জ্যান্থোফিল সমৃদ্ধ লাল, হলুদ বা কমলা রঙের প্লাস্টিড, যা ফুল ও ফলকে আকর্ষণীয় রঙ দেয়।
  • লিউকোপ্লাস্ট (Leucoplast): বর্ণহীন প্লাস্টিড যা খাদ্য সঞ্চয় করে। যেমন—অ্যামাইলোপ্লাস্ট (শ্বেতসার সঞ্চয়ী), অ্যালাইওপ্লাস্ট (তেল/লিপিড সঞ্চয়ী) এবং অ্যালেউরোপ্লাস্ট (প্রোটিন সঞ্চয়ী)।

৮. অন্যান্য সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণু ও নিউক্লিয়াস

  • রাইবোজোম (Ribosome): পর্দাযুক্ত নয় এমন অঙ্গাণু যা আরএনএ (RNA) ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত। ১৯৫৩ সালে জর্জ প্যালাডে এটি আবিষ্কার করেন। প্রোটিন তৈরির কারখানা হিসেবে এটি পরিচিত। ইউক্যারিওটে 80S (60S+40S) রাইবোজোম থাকে।
  • সাইটোস্কেলেটন (Cytoskeleton): প্রোটিন নির্মিত সূক্ষ্ম তন্তুর জালিকা (মাইক্রোটিউবিউল, মাইক্রোফিল্যামেন্ট) যা কোষের কাঠামো ও আকৃতি ধরে রাখে।
  • সেন্ট্রোসোম ও সেন্ট্রিওল (Centrosome & Centrioles): প্রাণী কোষে কোষ বিভাজনের সময় বেমতন্তু (Spindle fiber) গঠনে সহায়তা করে।
  • নিউক্লিয়াস (Nucleus): কোষের মস্তিষ্ক। এটি প্রধানত চারটি অংশ নিয়ে গঠিত—নিউক্লীয় পর্দা (Nuclear membrane), নিউক্লিয়োপ্লাজম (Nucleoplasm), নিউক্লিওলাস (Nucleolus - যা rRNA সংশ্লেষ করে) এবং ক্রোমোটিন জালিকা (Chromatin)। ক্রোমোটিন ফাইবার ঘনীভূত হয়ে কোষ বিভাজনের সময় ক্রোমোজোম (Chromosome) গঠন করে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: প্রোক্যারিওটিক এবং ইউক্যারিওটিক কোষের মধ্যে প্রধান প্রধান পার্থক্যগুলি কী কী?

উত্তর: প্রোক্যারিওটিক কোষে সুসংগঠিত নিউক্লিয়াস এবং পর্দাঘেরা অঙ্গাণু (যেমন মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বডি) থাকে না, নিউক্লিয়ার পর্দা অনুপস্থিত এবং রাইবোজোম 70S প্রকৃতির। পক্ষান্তরে, ইউক্যারিওটিক কোষে সুসংগঠিত নিউক্লিয়াস ও পর্দাঘেরা অঙ্গাণু বর্তমান এবং রাইবোজোম মূলত 80S প্রকৃতির (মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের ভেতর 70S থাকে)।

প্রশ্ন ২: ফ্লুইড মোজাইক মডেল অনুসারে প্লাজমা পর্দার গঠন সংক্ষেপে বর্ণনা করো।

উত্তর: সিঙ্গার ও নিকলসন কর্তৃক প্রস্তাবিত ফ্লুইড মোজাইক মডেল অনুযায়ী, প্লাজমা পর্দা হলো একটি দ্বি-স্তরীয় ফস্ফোলিপিড স্তরের সামুদ্রিক প্রবাহের মতো, যেখানে প্রোটিন অণুগুলি মোজাইকের মতো আংশিক বা সম্পূর্ণ ডুবে থাকে। লিপিডের অণুগুলির তরলতার কারণে প্রোটিনগুলি অনুভূমিকভাবে বিচরণ করতে পারে।

প্রশ্ন ৩: মাইটোকন্ড্রিয়া এবং ক্লোরোপ্লাস্টকে অর্ধ-স্বয়ংসম্পূর্ণ অঙ্গাণু (Semi-autonomous organelles) বলা হয় কেন?

উত্তর: মাইটোকন্ড্রিয়া এবং ক্লোরোপ্লাস্টের নিজস্ব বৃত্তাকার ডিএনএ (Circular DNA) এবং 70S রাইবোজোম রয়েছে। ফলে এরা নিজেদের প্রয়োজনীয় কিছু প্রোটিন ও উৎসেচক নিজেই সংশ্লেষ করতে পারে এবং কোষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে দ্বিখণ্ডনের মাধ্যমে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে। তাই এদের অর্ধ-স্বয়ংসম্পূর্ণ অঙ্গাণু বলা হয়।

প্রশ্ন ৪: কোষ তত্ত্বের সংশোধন বা পরিমার্জন কে করেন এবং কীভাবে?

উত্তর: ১৮৫৫ সালে বিজ্ঞানী রুডলফ ভার্চাও (Rudolf Virchow) শ্লাইডেন ও শোয়ানের কোষ তত্ত্বের সংশোধন করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে 'নতুন কোষ পূর্ববর্তী কোষ বিভাজনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়' ($ \text{Omnis cellula-e cellula}$)।

সারসংক্ষেপ

NCERT একাদশ শ্রেণির 'কোষ: জীবনের একক' অধ্যায়টির মূল সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:

  • কোষ হলো সমস্ত জীবের গঠনগত, কার্যগত এবং মৌলিক একক।
  • রুডলফ ভার্চাও-এর পরিমার্জিত কোষ তত্ত্ব বলে—সকল জীব কোষ ও কোষজাত বস্তু দিয়ে গঠিত এবং পূর্ববিদ্যমান কোষ থেকেই নতুন কোষের উদ্ভব হয়।
  • প্রোক্যারিওটিক কোষের নিউক্লিয়াস সুগঠিত নয় (নুয়েক্লিওয়েড) এবং আবরণীযুক্ত অঙ্গাণু থাকে না; যেখানে ইউক্যারিওটিক কোষে সুসংগঠিত নিউক্লিয়াস এবং এন্ডোমেমব্রেন সিস্টেমসহ নানা অঙ্গাণু থাকে।
  • কোষ পর্দা ফ্লুইড মোজাইক মডেল মেনে গঠিত এবং এটি একটি প্রভেদক ভেদ্য পর্দা।
  • মাইটোকন্ড্রিয়া শক্তি উৎপাদনে, ক্লোরোপ্লাস্ট খাদ্য তৈরিতে, এবং অ্যান্ডোপ্লাজমীয় জালিকা ও গলগি বডি প্রোটিন ও লিপিড পরিবহন ও সংশ্লেষে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।