বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের চারপাশে দৃশ্যমান প্রায় সমস্ত পদার্থই মৌলিক বা যৌগিক পদার্থের পরমাণু দ্বারা গঠিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুটি বা তার বেশি পরমাণু কেন একে অপরের সাথে যুক্ত হয়? কীভাবে তারা নির্দিষ্ট আণবিক আকার লাভ করে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর লুকিয়ে রয়েছে NCERT একাদশ শ্রেণির রসায়ন শাস্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় 'রাসায়নিক বন্ধন ও আণবিক গঠন' (Chemical Bonding and Molecular Structure)-এ।
প্রকৃতিতে নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলি (যেমন: হিলিয়াম, নিয়ন, আর্গন ইত্যাদি) ব্যতীত অন্য প্রায় সমস্ত মৌলের পরমাণু এককভাবে স্বাধীনভাবে থাকতে পারে না। তারা স্থায়িত্ব (stability) অর্জনের জন্য অন্য পরমাণুর সাথে যুক্ত হয়ে অণু গঠন করে। যে আকর্ষণ বলের মাধ্যমে একাধিক পরমাণু বা আয়ন একত্রে আবদ্ধ হয়ে একটি স্থায়ী রাসায়নিক প্রজাতি গঠন করে, তাকেই রাসায়নিক বন্ধন (Chemical Bond) বলা হয়। এই অধ্যায়ে আমরা বন্ধনের প্রকারভেদ, আণবিক গঠন এবং বিভিন্ন আধুনিক তত্ত্ব সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করব।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. রাসায়নিক বন্ধনের ইলেকট্রনীয় তত্ত্ব এবং অষ্টক সূত্র (Octet Rule)
১৯১৬ সালে বিজ্ঞানী কসেল (Kossel) এবং লুইস (Lewis) পরমাণুগুলির রাসায়নিক বন্ধন গঠনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অষ্টক সূত্র (Octet Rule) প্রকাশ করেন। এই সূত্র অনুসারে, পরমাণুগুলি তাদের সর্ববহিঃস্থ কক্ষে (Valence shell) আটটি ইলেকট্রন লাভ করে নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মতো স্থায়ী ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জনের চেষ্টা করে। এর জন্য পরমাণুগুলি ইলেকট্রন গ্রহণ, বর্জন বা শেয়ার করে থাকে।
- লুইস প্রতীক (Lewis Symbols): পরমাণুর যোজ্যতা ইলেকট্রনগুলিকে পরমাণুর চিহ্নের চারপাশে বিন্দুর (dots) সাহায্যে প্রকাশ করাকে লুইস প্রতীক বলে। উদাহরণস্বরূপ, সোডিয়ামের (Na) ক্ষেত্রে এটি \(\text{Na}\cdot\) এবং ক্লোরিনের (Cl) ক্ষেত্রে \(:\ddot{\text{Cl}}:\) দ্বারা দেখানো হয়।
- অষ্টক সূত্রের সীমাবদ্ধতা: কিছু যৌগে কেন্দ্রীয় পরমাণুর অষ্টক অসম্পূর্ণ থাকে (যেমন: \(\text{LiCl}\), \(\text{BF}_3\)), আবার কিছু যৌগে অষ্টক সম্প্রসারিত হয় (যেমন: \(\text{PF}_5\), \(\text{SF}_6\))। এছাড়া অসংযোজী ইলেকট্রন বিশিষ্ট অণুতে (যেমন: \(\text{NO}\)) এই সূত্র খাটে না।
২. তড়িৎযোজী বা আয়নীয় বন্ধন (Ionic or Electrovalent Bond)
একটি তীব্র তড়িৎ-ধনাত্মক ধাতু এবং একটি তীব্র তড়িৎ-ঋণাত্মক অধাতুর মধ্যে ইলেকট্রন স্থানান্তরের মাধ্যমে যে বন্ধন তৈরি হয়, তাকে আয়নীয় বন্ধন বলে।
উদাহরণস্বরূপ, সোডিয়াম ক্লোরাইড (\(\text{NaCl}\)) গঠনের সময়:
\(\text{Na} \rightarrow \text{Na}^+ + e^-\)
\(\text{Cl} + e^- \rightarrow \text{Cl}^-\)
\(\text{Na}^+ + \text{Cl}^- \rightarrow \text{NaCl}\)
- ল্যাটিস শক্তি (Lattice Energy): এক মোল কঠিন আয়নীয় কেলাস গঠন করতে এর উপাদানী গ্যাসিও আয়নগুলি একত্রিত হলে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, তাকে ল্যাটিস শক্তি বলে। ল্যাটিস শক্তি যত বেশি হয়, আয়নীয় যৌগ তত বেশি স্থায়ী হয়।
৩. সমযোজী বন্ধন (Covalent Bond)
যখন দুটি অধাতব পরমাণু ইলেকট্রন জোড় সমভাবে ব্যবহার করে অষ্টক পূর্ণ করে, তখন তাদের মধ্যে সৃষ্ট বন্ধনকে সমযোজী বন্ধন বলে। বিজ্ঞানী জি. এন. লুইস এটি উদ্ভাবন করেন।
- একক বন্ধন (Single Bond): এক জোড়া ইলেকট্রন শেয়ার হলে (যেমন: \(\text{H}_2\), \(\text{Cl}_2\))।
- দ্বিবন্ধন (Double Bond): দুই জোড়া ইলেকট্রন শেয়ার হলে (যেমন: \(\text{O}_2\))।
- ত্রিবন্ধন (Triple Bond): তিন জোড়া ইলেকট্রন শেয়ার হলে (যেমন: \(\text{N}_2\))।
৪. বন্ধন পরামিতি (Bond Parameters)
- বন্ধনের দৈর্ঘ্য (Bond Length): সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ দুটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের মধ্যবর্তী গড় দূরত্বকে বন্ধন দৈর্ঘ্য বলে।
- বন্ধন কোণ (Bond Angle): অণুর কেন্দ্রীয় পরমাণুর চারপাশে থাকা দুটি বন্ধনী-কক্ষকের মধ্যে গঠিত কোণকে বন্ধন কোণ বলে।
- বন্ধন এন্থালপি (Bond Enthalpy): গ্যাসিও অবস্থায় এক মোল নির্দিষ্ট ধরনের বন্ধন ভাঙতে প্রয়োজনীয় শক্তিকে বন্ধন এন্থালপি বলে।
- বন্ধন ক্রম (Bond Order): দুটি পরমাণুর মধ্যে উপস্থিত মোট বন্ধনের সংখ্যাকে বন্ধন ক্রম বলে। যেমন: \(\text{N}_2\)-এর বন্ধন ক্রম ৩।
৫. VSEPR তত্ত্ব (Valence Shell Electron Pair Repulsion Theory)
বিজ্ঞানী সিজউইক এবং পাওয়েল ১৯৪০ সালে এবং পরবর্তীতে গিলেস্পি ও নাইহোম এই তত্ত্বটি উন্নত করেন। এই তত্ত্ব অনুসারে, কোনো অণুর কেন্দ্রীয় পরমাণুর যোজ্যতা কক্ষের ইলেকট্রন জোড়গুলি (বন্ধন জোড় ও নিঃসঙ্গ জোড়) বিকর্ষণের কারণে এমনভাবে বিন্যস্ত হয় যাতে তাদের মধ্যে বিকর্ষণ সর্বনিম্ন এবং স্থায়িত্ব সর্বোচ্চ হয়।
বিকর্ষণের ক্রমানুসারে: নিঃসঙ্গ জোড় - নিঃসঙ্গ জোড় (lp - lp) > নিঃসঙ্গ জোড় - বন্ধন জোড় (lp - bp) > বন্ধন জোড় - বন্ধন জোড় (bp - bp)
- \(\text{CH}_4\)-এর ক্ষেত্রে ৪টি বন্ধন জোড় থাকায় আকৃতি চতুস্তলকীয় (Tetrahedral)।
- \(\text{NH}_3\)-এর ক্ষেত্রে ৩টি বন্ধন জোড় ও ১টি নিঃসঙ্গ জোড় থাকায় আকৃতি ট্রাইগোনাল পিরামিডাল।
- \(\text{H}_2\text{O}\)-এর ক্ষেত্রে ২টি বন্ধন জোড় ও ২টি নিঃসঙ্গ জোড় থাকায় আকৃতি বাঁকানো বা V-আকৃতির।
৬. সংকরায়ন বা হাইব্রিডাইজেশন (Hybridization)
বিজ্ঞানী পলিং-এর মতে, প্রায় সমশক্তিবিশিষ্ট একাধিক পারমাণবিক কক্ষক পরস্পরের সাথে মিশ্রিত হয়ে সমসংখ্যক ও সমশক্তিবিশিষ্ট নতুন সংকর কক্ষক তৈরি করার প্রক্রিয়াকে সংকরায়ন বলে।
- sp সংকরায়ন: ১টি s ও ১টি p কক্ষকের মিশ্রণ (যেমন: \(\text{BeCl}_2\)), আকৃতি রৈখিক (১৮০ degree)।
- sp² সংকরায়ন: ১টি s ও ২টি p কক্ষকের মিশ্রণ (যেমন: \(\text{BF}_3\)), আকৃতি ত্রিকোণীয় সমতলীয় (১২০ degree)।
- sp³ সংকরায়ন: ১টি s ও ৩টি p কক্ষকের মিশ্রণ (যেমন: \(\text{CH}_4\)), আকৃতি চতুস্তলকীয় (১০৯.৫ degree)।
৭. হাইড্রোজেন বন্ধন (Hydrogen Bonding)
হাইড্রোজেন পরমাণু যখন তীব্র তড়িৎ-ঋণাত্মক মৌলের (যেমন: F, O, N) সাথে যুক্ত থাকে, তখন এটি আংশিক ধনাত্মক আধান লাভ করে। এই অবস্থায় এটি অপর একটি তীব্র তড়িৎ-ঋণাত্মক পরমাণুর সাথে দুর্বল স্থির-তড়িৎ আকর্ষণ বল দ্বারা যুক্ত হলে তাকে হাইড্রোজেন বন্ধন বলে।
- অন্তর-আণবিক হাইড্রোজেন বন্ধন (Intermolecular): দুটি ভিন্ন অণুর মধ্যে গঠিত হয় (যেমন: \(\text{H}_2\text{O}\), \(\text{HF}\))। এর ফলে স্ফুটনাঙ্ক বৃদ্ধি পায়।
- অন্তঃ-আণবিক হাইড্রোজেন বন্ধন (Intramolecular): একই অণুর ভেতরের দুটি পরমাণুর মধ্যে গঠিত হয় (যেমন: অর্থো-নাইট্রোফেনল)।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: অষ্টক সূত্রের প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলি কী কী?
উত্তর: অষ্টক সূত্রের প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলি হলো: (১) অষ্টক অসম্পূর্ণ থাকা (যেমন: \(\text{LiCl}\), \(\text{BF}_3\) যৌগে কেন্দ্রীয় পরমাণুর ৮টির কম ইলেকট্রন থাকে), (২) অসম্পূর্ণ অষ্টক সম্প্রসারণ (যেমন: \(\text{SF}_6\) যৌগে সালফারের ১২টি ইলেকট্রন থাকে), এবং (৩) এটি অণুর গঠন, আকৃতি ও স্থায়িত্ব সম্পর্কে কোনো সঠিক ধারণা দিতে পারে না।
প্রশ্ন ২: পানির (\(\text{H}_2\text{O}\)) অণুর আকৃতি চতুস্তলকীয় না হয়ে V-আকৃতির বা বাঁকানো হয় কেন?
উত্তর: পানির অণুর কেন্দ্রীয় অক্সিজেন পরমাণুর \(sp^3\) সংকরায়ন ঘটে, যার আদর্শ আকৃতি চতুস্তলকীয় হওয়ার কথা। কিন্তু অক্সিজেনের সর্ববহিঃস্থ কক্ষে ২টি বন্ধন জোড় এবং ২টি নিঃসঙ্গ জোড় (Lone pair) থাকে। VSEPR তত্ত্ব অনুসারে, lp - lp বিকর্ষণ bp - bp বিকর্ষণের চেয়ে অনেক বেশি। এই তীব্র বিকর্ষণের কারণে বন্ধন কোণ ১০৯.৫ degree থেকে কমে ১০৪.৫ degree হয়ে যায় এবং অণুর আকৃতি বাঁকানো (Bent/V-shaped) হয়।
প্রশ্ন ৩: সিগমা (\(\sigma\)) এবং পাই (\(\pi\)) বন্ধনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
উত্তর: সিগমা বন্ধন গঠিত হয় দুটি পারমাণবিক কক্ষকের অক্ষ বরাবর মুখোমুখি (head-on) ওভারল্যাপিংয়ের মাধ্যমে, যা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে, পাই বন্ধন গঠিত হয় অক্ষের সাথে সমান্তরালভাবে (sideways) ওভারল্যাপিংয়ের মাধ্যমে, যা সিগমা বন্ধনের চেয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল হয়।
প্রশ্ন ৪: সাধারণ উষ্ণতায় পানি (\(\text{H}_2\text{O}\)) তরল কিন্তু হাইড্রোজেন সালফাইড (\(\text{H}_2\text{S}\)) গ্যাসীয় কেন?
উত্তর: অক্সিজেনের তড়িৎ-ঋণাত্মকতা সালফারের চেয়ে অনেক বেশি এবং আকার ছোট। ফলে পানির অণুগুলির মধ্যে শক্তিশালী অন্তর-আণবিক হাইড্রোজেন বন্ধন গঠিত হয় এবং তারা পুঞ্জীভূত অবস্থায় থাকে। অন্যদিকে, \(\text{H}_2\text{S}\)-এ হাইড্রোজেন বন্ধন তৈরি হতে পারে না। ফলে সাধারণ উষ্ণতায় পানি তরল হলেও \(\text{H}_2\text{S}\) গ্যাসে পরিণত হয়।
সারসংক্ষেপ
- পরমাণুগুলি তাদের স্থায়ী অষ্টক বিন্যাস অর্জনের জন্য আয়নীয় বা সমযোজী বন্ধন তৈরি করে।
- VSEPR তত্ত্বের মাধ্যমে অণুর ত্রিমাত্রিক আকৃতি ও বন্ধন কোণ নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
- সংকরায়ন (sp, sp², sp³) হলো পারমাণবিক কক্ষকের মিশ্রণের মাধ্যমে সমশক্তি সম্পন্ন নতুন সংকর কক্ষক তৈরির প্রক্রিয়া।
- হাইড্রোজেন বন্ধন অণুর ভৌত ধর্ম যেমন—স্ফুটনাঙ্ক, দ্রাব্যতা ও ভৌত অবস্থা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।