বিষয়ের ভূমিকা
দ্বাদশ শ্রেণি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অধ্যায়ে আমরা ভারতের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি এবং স্বাধীন ভারতের বিদেশনীতির বিবর্তন সম্পর্কে আলোচনা করব। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত কীভাবে তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে নিজের অবস্থান মজবুত করেছে, তা এখানে বিস্তারিতভাবে ফুটে উঠেছে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
ভারতের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি
স্বাধীনতার পর জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারত এমন এক বিদেশনীতি গ্রহণ করেছিল যা শান্তি ও বন্ধুত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এর মূল লক্ষ্যগুলো হলো:
- সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা: ঔপনিবেশিক শাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ভারত সর্বদা তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
- জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM): স্নায়ুযুদ্ধের সময় ভারত কোনো সামরিক ব্লকে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়ন) যোগ না দিয়ে স্বাধীন পথ বেছে নিয়েছিল, যা ইতিহাসে জোটনিরপেক্ষ নীতি হিসেবে পরিচিত।
- শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণ: ভারত বিশ্বশান্তি বজায় রাখা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসারের বিরুদ্ধে সর্বদা সরব থেকেছে।
ভারতের সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সম্পর্ক
ভারত তার প্রতিবেশীদের সাথে সর্বদা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছে, যদিও বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক কারণে তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে:
- চীন-ভারত সম্পর্ক: ১৯৫৪ সালে পঞ্চশীল নীতির মাধ্যমে ভারত ও চীনের মধ্যে মৈত্রী স্থাপিত হলেও ১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধ সম্পর্ককে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে।
- পাকিস্তান-ভারত সম্পর্ক: কাশ্মীর ইস্যু এবং বিভিন্ন যুদ্ধের কারণে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক ইতিহাসের অধিকাংশ সময় উত্তেজনাপূর্ণ ছিল।
- বাংলাদেশ গঠন: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তন এনেছিল।
ভারতের পারমাণবিক নীতি
ভারত ১৯৭৪ সালে পোখরানে প্রথম সফল পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, যাকে 'শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিস্ফোরণ' বলা হয়। ভারত বরাবরই বলে এসেছে যে, তাদের পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্য।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
- প্রশ্ন: পঞ্চশীল নীতি কী?
উত্তর: ১৯৫৪ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত পাঁচটি শান্তির নীতি, যার মধ্যে রয়েছে একে অপরের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানানো এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। - প্রশ্ন: জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অর্থ কী?
উত্তর: স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিশ্বের কোনো বড় সামরিক ব্লকের (Power Bloc) সাথে যুক্ত না হয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করাই হলো জোটনিরপেক্ষতা। - প্রশ্ন: ভারতের বিদেশনীতির প্রধান রূপকার কে ছিলেন?
উত্তর: ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ভারতের বিদেশনীতির প্রধান রূপকার ছিলেন।
সারসংক্ষেপ
- ভারত বরাবরই বিশ্বশান্তি ও উন্নয়নের পক্ষপাতী।
- জোটনিরপেক্ষ নীতি ভারতের বিদেশনীতির মেরুদণ্ড।
- ভারত তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এগোতে চায়।
- বিশ্বমঞ্চে ভারত আজ একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে স্বীকৃত।