বিষয়ের ভূমিকা

ইতিহাসের পাতায় রুশ বিপ্লব (Russian Revolution) শুধুমাত্র একটি দেশের ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং এটি ছিল বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী একটি ঘটনা। নবম শ্রেণির ইতিহাসের এই দ্বিতীয় অধ্যায়টি আমাদের সেই সময়ের কথা বলে যখন রাজা ও সম্রাটদের শাসনের দিন ফুরিয়ে আসছিল এবং সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা আসার নতুন স্বপ্ন দেখা দিচ্ছিল। এই অধ্যায়ে আমরা জানব কীভাবে সমাজতন্ত্রের (Socialism) ধারণা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং কীভাবে রাশিয়াতে সেটি একটি সফল বিপ্লবের রূপ নিয়েছিল। এই অধ্যায়টি পড়লে আমরা বুঝতে পারব কীভাবে শিল্পায়ন, রাজনৈতিক আদর্শ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ একটি জাতিকে আমূল বদলে দিতে পারে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই অধ্যায়টি বুঝতে হলে আমাদের কয়েকটি ধাপে এগোতে হবে। নিচে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. সামাজিক পরিবর্তনের যুগ (The Age of Social Change)

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ফরাসি বিপ্লব পুরো ইউরোপে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং অধিকারের নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল। সমাজ কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে তিনটি ভিন্ন মতাদর্শ তৈরি হয়:

  • উদারপন্থী (Liberals): তারা এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিলেন যেখানে সব ধর্মকে সমান সম্মান দেওয়া হবে। তারা বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের বিরোধী ছিলেন এবং নির্বাচিত সংসদীয় সরকার চেয়েছিলেন। তবে তারা সার্বজনীন ভোটাধিকারের (Universal Adult Franchise) পক্ষে ছিলেন না; তারা মনে করতেন কেবল সম্পদশালী পুরুষদেরই ভোট দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।
  • র‍্যাডিক্যাল (Radicals): তারা জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সরকার চেয়েছিলেন। তারা নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন এবং ভূস্বামী ও শিল্পপতিদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধার বিরোধিতা করতেন।
  • রক্ষণশীল (Conservatives): এরা পরিবর্তনের বিরোধী ছিলেন। তবে ফরাসি বিপ্লবের পর তারা বুঝতে পারেন যে পরিবর্তন অনিবার্য। কিন্তু তারা চেয়েছিলেন পরিবর্তন হোক ধীরগতিতে এবং অতীত ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান রেখে।

২. শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যা

নতুন নতুন শিল্প গড়ে ওঠার ফলে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসতে শুরু করে। এর ফলে কর্মসংস্থান হলেও আবাসন সমস্যা এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের কাজের সময় ছিল দীর্ঘ এবং মজুরি ছিল অত্যন্ত কম। এই পরিস্থিতিতে উদারপন্থী এবং র‍্যাডিক্যালরা মনে করতে শুরু করেন যে সমাজের উন্নয়নের জন্য শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি এবং শিক্ষার প্রসার প্রয়োজন।

৩. ইউরোপে সমাজতন্ত্রের উত্থান

সমাজতন্ত্রীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান। তারা মনে করতেন যে ব্যক্তিগত সম্পত্তিই হলো সমাজের সব সমস্যার মূলে। কারণ, সম্পদের মালিকরা কেবল নিজেদের মুনাফা দেখেন, তারা শ্রমিকদের কথা ভাবেন না।

কার্ল মার্কস (Karl Marx) এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels) এই বিষয়ে নতুন দিশা দেখান। মার্কস যুক্তি দিয়েছিলেন যে শিল্প সমাজ হলো 'পুঁজিবাদী' (Capitalist)। পুঁজিবাদীরা শ্রমিকদের শ্রমের বিনিময়ে মুনাফা অর্জন করে, কিন্তু সেই মুনাফায় শ্রমিকদের কোনো ভাগ থাকে না। তিনি মনে করতেন, শ্রমিকদের শোষণমুক্ত হতে হলে ব্যক্তিগত মালিকানা তুলে দিয়ে একটি 'কমিউনিস্ট সমাজ' গঠন করতে হবে।

৪. রুশ সাম্রাজ্য (১৯১৪) এবং সামাজিক অবস্থা

১৯১৪ সালে রাশিয়া শাসন করতেন জার দ্বিতীয় নিকোলাস (Tsar Nicholas II)। রুশ সাম্রাজ্য ছিল বিশাল, যা বর্তমানের ফিনল্যান্ড, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাশিয়ার জনসংখ্যার প্রায় ৮৫% ছিল কৃষিজীবী। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় রাশিয়ায় কৃষিকাজের হার অনেক বেশি ছিল। অন্যদিকে, শিল্পায়ন ছিল মূলত সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং মস্কো কেন্দ্রিক।

রাশিয়ার কৃষকদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। তারা তাদের জমিগুলোকে মাঝে মাঝে একত্র করত (যাকে 'মির' বলা হতো) এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা ভাগ করে নিত। এটি ছিল সমাজতন্ত্রের এক স্বাভাবিক রূপ।

৫. ১৯০৫ সালের বিপ্লব এবং 'রক্তাক্ত রবিবার' (Bloody Sunday)

১৯০৪ সালটি রুশ শ্রমিকদের জন্য ছিল অত্যন্ত সংকটময়। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ১৯০৫ সালের জানুয়ারি মাসে ফাদার গেপনের নেতৃত্বে শ্রমিকরা যখন জারের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিতে সেন্ট পিটার্সবার্গের উইন্টার প্যালেসে যাচ্ছিলেন, তখন পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। ১০০ জনেরও বেশি শ্রমিক নিহত হন। এই ঘটনা ইতিহাসে 'রক্তাক্ত রবিবার' নামে পরিচিত। এরপর সারা দেশে ধর্মঘট শুরু হয় এবং জার শেষ পর্যন্ত একটি নির্বাচিত সংসদ বা 'ডুমা' (Duma) গঠনে সম্মত হন।

৬. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং রাশিয়া

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়া জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। শুরুতে মানুষ জারকে সমর্থন করলেও যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধারণ মানুষকে হতাশ করে। ১৯১৪ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে রাশিয়া জার্মানির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং প্রায় ৭০ লক্ষ রুশ সৈন্য নিহত হয়। এর ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে এবং খাদ্যাভাব চরম আকার ধারণ করে।

৭. ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব

১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে (পুরানো রুশ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী) খাদ্য সংকটের ফলে পেট্রোগ্রাডের শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করেন। সেনাবাহিনীও শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে এবং শ্রমিকদের সাথে যোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত জার দ্বিতীয় নিকোলাস সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন। একটি 'অস্থায়ী সরকার' (Provisional Government) গঠিত হয়।

৮. অক্টোবর বিপ্লব এবং ভ্লাদিমির লেনিন

বিপ্লবের পর বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির লেনিন রাশিয়াতে ফিরে আসেন। তিনি তার বিখ্যাত 'এপ্রিল থিসিস' (April Theses) পেশ করেন, যেখানে তিনটি দাবি ছিল:

  • যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।
  • জমি কৃষকদের হাতে তুলে দিতে হবে।
  • ব্যাঙ্কগুলোকে জাতীয়করণ করতে হবে।

অস্থায়ী সরকারের সাথে বলশেভিকদের দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর (নতুন ক্যালেন্ডারে ৭ নভেম্বর) বলশেভিকরা পেট্রোগ্রাডের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সারা দেশে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে। এটিই ইতিহাসে রুশ বিপ্লব বা অক্টোবর বিপ্লব নামে পরিচিত।

৯. বিপ্লব পরবর্তী পরিবর্তন এবং গৃহযুদ্ধ

ক্ষমতায় আসার পর বলশেভিকরা বড় জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে এবং কৃষকদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়। শিল্প ও ব্যাংকগুলোকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনা হয়। তবে এই পরিবর্তন সবাই মেনে নেয়নি। রাজতন্ত্রী (The Whites) এবং সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীরা (The Greens) বলশেভিকদের (The Reds) বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, যা রুশ গৃহযুদ্ধ নামে পরিচিত। শেষ পর্যন্ত ১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) গঠিত হয়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

১. 'এপ্রিল থিসিস' কী ছিল?
উঃ ১৯১৭ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির লেনিন তিনটি প্রধান দাবি পেশ করেন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বন্ধ করা, জমি কৃষকদের বন্টন করা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার জাতীয়করণ। এই দাবিগুলোকেই 'এপ্রিল থিসিস' বলা হয়।

২. রুশ বিপ্লবে শ্রমিকদের ভূমিকা কী ছিল?
উঃ রুশ বিপ্লবের প্রাণশক্তি ছিল শ্রমিকরা। ১৯০৫ সালের রক্তাক্ত রবিবার থেকে শুরু করে ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি ও অক্টোবর বিপ্লব পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে শ্রমিকদের ধর্মঘট ও সংগঠন বিপ্লবকে সফল করতে সাহায্য করেছিল।

৩. বলশেভিক এবং মেনশেভিকদের মধ্যে পার্থক্য কী ছিল?
উঃ বলশেভিকরা ছিল লেনিনের নেতৃত্বে একটি সুশৃঙ্খল দল যারা বিশ্বাস করত কঠোর বিপ্লবের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে হবে। অন্যদিকে মেনশেভিকরা মনে করত যে দলের সদস্যপদ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত এবং ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সারসংক্ষেপ

  • রুশ বিপ্লব ছিল সামন্ততন্ত্র ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ।
  • কার্ল মার্কসের সমাজতান্ত্রিক আদর্শ এই বিপ্লবের মূল ভিত্তি ছিল।
  • ১৯০৫ সালের রক্তাক্ত রবিবার জার শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়।
  • ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং অক্টোবর বিপ্লবে বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করে।
  • এই বিপ্লবের ফলেই বিশ্বে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।