বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা অগণিত সম্পদ ব্যবহার করি। এর মধ্যে কিছু সম্পদ আমরা প্রকৃতি থেকে সরাসরি পাই, আর কিছু মানুষের দ্বারা তৈরি। প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত এই অমূল্য সম্পদগুলোকে আমরা 'প্রাকৃতিক সম্পদ' বলি। অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের এই তৃতীয় অধ্যায়টি আমাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি—কয়লা ও পেট্রোলিয়াম—সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেয়। এই সম্পদগুলো কীভাবে তৈরি হয়, কেন এদের 'জীবাশ্ম জ্বালানি' বলা হয় এবং কেন আমাদের এগুলো ভেবেচিন্তে ব্যবহার করা উচিত, সেই সব কিছুই এই আলোচনায় উঠে আসবে। আধুনিক সভ্যতার চাকা সচল রাখতে এই জ্বালানিগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম, অথচ এগুলোর ভাণ্ডার অত্যন্ত সীমিত। আজকের এই ব্লগ পোস্টে আমরা এনসিইআরটি (NCERT) সিলেবাস অনুযায়ী এই অধ্যায়টির প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় সহজভাবে বিশ্লেষণ করব।
প্রাকৃতিক সম্পদের প্রকারভেদ
প্রকৃতিতে পাওয়া সম্পদের স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে আমরা এদের দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি:
- অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ (Inexhaustible Natural Resources): এই সম্পদগুলো প্রকৃতিতে অঢেল পরিমাণে রয়েছে এবং মানুষের ব্যবহারের ফলে এগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। উদাহরণস্বরূপ: সূর্যের আলো এবং বায়ু।
- নিঃশেষযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ (Exhaustible Natural Resources): এই সম্পদগুলো প্রকৃতিতে সীমিত পরিমাণে আছে। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এগুলো অদূর ভবিষ্যতে শেষ হয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ: বনভূমি, বন্যপ্রাণী, খনিজ পদার্থ, কয়লা, পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস।
কয়লা ও পেট্রোলিয়াম এই দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, কারণ এগুলো তৈরি হতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে।
জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil Fuels) কী?
কয়লা, পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস মূলত মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ থেকে তৈরি হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বছর আগে মাটির নিচে চাপা পড়া এই দেহাবশেষগুলো প্রচণ্ড তাপ ও চাপের ফলে জ্বালানিতে রূপান্তরিত হয়। যেহেতু এগুলো মৃত জীবের ধ্বংসাবশেষ বা 'জীবাশ্ম' (Fossils) থেকে তৈরি, তাই এদের জীবাশ্ম জ্বালানি বলা হয়।
কয়লা (Coal): উৎপত্তি ও ব্যবহার
কয়লা একটি শক্ত, কালো রঙের পাথর সদৃশ পদার্থ। এটি রান্নার কাজে, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কয়লার উৎপত্তির গল্প
প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে প্রচুর ঘন বনভূমি ছিল। নিচু জলাভূমি অঞ্চলে থাকা এই গাছপালাগুলো বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের (যেমন বন্যা) ফলে মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে তাদের ওপর মাটির স্তর জমা হতে থাকে এবং তারা মাটির অনেক গভীরে চলে যায়। সেখানে উচ্চ তাপ এবং প্রচণ্ড চাপের ফলে মৃত উদ্ভিদগুলো ধীরে ধীরে কয়লায় রূপান্তরিত হয়। মৃত উদ্ভিদ থেকে কয়লায় এই রূপান্তরের মন্থর প্রক্রিয়াকে কার্বনাইজেশন (Carbonization) বলা হয়।
কয়লা থেকে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ উপজাত দ্রব্যসমূহ
শিল্পকারখানায় কয়লা প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে আমরা তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদার্থ পাই:
- কোক (Coke): এটি কয়লার একটি বিশুদ্ধ রূপ। এটি একটি শক্ত, সচ্ছিদ্র এবং কালো পদার্থ। ইস্পাত তৈরিতে এবং বিভিন্ন ধাতু নিষ্কাশনে কোক ব্যবহৃত হয়।
- কোল টার (Coal Tar): এটি একটি ঘন, কালো ও অপ্রীতিকর গন্ধযুক্ত তরল। এটি প্রায় ২০০টি ভিন্ন পদার্থের মিশ্রণ। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত রং, ওষুধ, বিস্ফোরক, সুগন্ধি, প্লাস্টিক এবং ন্যাপথালিন বল তৈরিতে কোল টার ব্যবহৃত হয়।
- কোল গ্যাস (Coal Gas): কয়লা থেকে কোক তৈরির সময় এই গ্যাসটি উৎপন্ন হয়। আগে এটি আলোকসজ্জার কাজে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে এটি শিল্পাঞ্চলে তাপের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পেট্রোলিয়াম (Petroleum): তরল সোনা
মোটরসাইকেল, গাড়ি বা ট্রাক চালানোর জন্য আমরা যে পেট্রোল বা ডিজেল ব্যবহার করি, তা মূলত পেট্রোলিয়াম নামক প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া যায়। 'পেট্রোলিয়াম' শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'পেট্রা' (পাথর) এবং 'ওলিয়াম' (তেল) থেকে এসেছে।
পেট্রোলিয়ামের গঠন প্রক্রিয়া
সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবের দেহাবশেষ থেকে পেট্রোলিয়াম তৈরি হয়। এই জীবগুলো মারা যাওয়ার পর তাদের দেহ সমুদ্রের তলায় জমা হয় এবং বালি ও কাদার স্তরে ঢাকা পড়ে যায়। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বাতাসের অনুপস্থিতি, উচ্চ তাপমাত্রা এবং প্রচণ্ড চাপের প্রভাবে এই মৃত দেহাবশেষগুলো পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাসে পরিণত হয়।
পেট্রোলিয়াম শোধন (Refining of Petroleum)
খনি থেকে উত্তোলিত পেট্রোলিয়াম বা অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। এটি বিভিন্ন উপাদানের মিশ্রণ। এই উপাদানগুলোকে আলাদা করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় শোধন বা রিফাইনিং। পেট্রোলিয়াম রিফাইনারিতে এই কাজটি করা হয়। পেট্রোলিয়াম থেকে প্রাপ্ত প্রধান অংশগুলো হলো:
- LPG (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস): বাড়ি ও শিল্পে জ্বালানি হিসেবে।
- পেট্রোল: হালকা যানবাহনের জ্বালানি এবং ড্রাই ক্লিনিং-এর দ্রাবক হিসেবে।
- কেরোসিন: স্টোভ, ল্যাম্প এবং জেট বিমানের জ্বালানি হিসেবে।
- ডিজেল: ভারী যানবাহন এবং বৈদ্যুতিক জেনারেটরের জ্বালানি হিসেবে।
- লুব্রিকেটিং তেল: যন্ত্রপাতিতে ঘর্ষণ কমানোর পিচ্ছিলকারক হিসেবে।
- প্যারাফিন মোম: মলম, মোমবাতি এবং ভ্যাসলিন তৈরিতে।
- বিটুমিন: রং তৈরি এবং রাস্তার উপরিভাগ পাকা করার কাজে।
প্রাকৃতিক গ্যাস (Natural Gas)
প্রাকৃতিক গ্যাস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিবেশবান্ধব জীবাশ্ম জ্বালানি। এটি পাইপের মাধ্যমে সহজেই পরিবহন করা যায়। যখন এই গ্যাসকে উচ্চ চাপে সঞ্চয় করা হয়, তখন তাকে CNG (Compressed Natural Gas) বলা হয়।
CNG-এর সুবিধা:
- এটি খুব কম দূষণ ঘটায়।
- এটি একটি পরিষ্কার জ্বালানি।
- এটি সরাসরি রান্নার কাজে বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়।
- বর্তমানে এটি যানবাহন চালানোর জন্য পেট্রোল ও ডিজেলের বিকল্প হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও সংরক্ষণ
আমরা জানি যে কয়লা ও পেট্রোলিয়াম তৈরি হতে লক্ষ লক্ষ বছর লাগে, কিন্তু এগুলো ব্যবহারের হার এত বেশি যে আগামী কয়েকশ বছরের মধ্যেই এই ভাণ্ডার শেষ হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, এই জ্বালানিগুলো পোড়ালে কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয় যা বায়ুদূষণ এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং (Global Warming) বা বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রধান কারণ।
তাই আমাদের উচিত:
- প্রয়োজন ছাড়া জ্বালানি ব্যবহার না করা।
- বিকল্প শক্তির উৎস যেমন সৌর শক্তি বা বায়ু শক্তি ব্যবহার বাড়ানো।
- ভারতে PCRA (Petroleum Conservation Research Association) গাড়ি চালানোর সময় পেট্রোল/ডিজেল বাঁচানোর জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে:
- গাড়ি মাঝারি ও স্থির গতিতে চালানো।
- ট্রাফিক সিগন্যালে বা অপেক্ষার সময় ইঞ্জি বন্ধ রাখা।
- টায়ারের বায়ুচাপ সঠিক রাখা।
- নিয়মিত গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করা।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. কয়লাকে কেন জীবাশ্ম জ্বালানি বলা হয়?
উত্তর: কয়লা লক্ষ লক্ষ বছর আগে মাটির নিচে চাপা পড়া মৃত উদ্ভিদ ও বনের অবশিষ্টাংশ থেকে তৈরি হয়েছে। যেহেতু এটি মৃত জীবের অবশেষ বা জীবাশ্ম থেকে উৎপন্ন, তাই একে জীবাশ্ম জ্বালানি বলা হয়।
২. বিটুমিন-এর একটি আধুনিক ব্যবহার উল্লেখ করো।
উত্তর: আগে রাস্তার উপরিভাগ তৈরির জন্য কোল টার ব্যবহৃত হতো, কিন্তু বর্তমানে কোল টারের পরিবর্তে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য 'বিটুমিন' রাস্তা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়।
৩. কার্বনাইজেশন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: উচ্চ চাপ ও তাপমাত্রায় মৃত উদ্ভিদ থেকে ধীরে ধীরে কয়লায় রূপান্তরিত হওয়ার মন্থর রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে কার্বনাইজেশন বলা হয়।
৪. CNG-কে কেন পরিবেশবান্ধব জ্বালানি বলা হয়?
উত্তর: কারণ CNG দহনের ফলে অন্যান্য জ্বালানির তুলনায় অনেক কম ক্ষতিকারক ধোঁয়া এবং দূষক কণা উৎপন্ন হয়।
সারসংক্ষেপ
- প্রাকৃতিক সম্পদ দুই প্রকার—অফুরন্ত ও নিঃশেষযোগ্য।
- কয়লা, পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস হলো জীবাশ্ম জ্বালানি।
- কয়লার প্রধান উপজাত হলো কোক, কোল টার এবং কোল গ্যাস।
- পেট্রোলিয়াম শোধনের মাধ্যমে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন এবং লুব্রিকেটিং তেল পাওয়া যায়।
- জীবাশ্ম জ্বালানি সীমিত, তাই এদের অপচয় রোধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
- জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী।