ইতিহাস আমাদের কেবল অতীত ঘটনা সম্পর্কে অবগত করে না, বরং এটি আমাদের শেখায় কীভাবে বিশেষ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তিত হতে পারে। নবম শ্রেণির ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায় ‘নাৎসিবাদ এবং হিটলারের উত্থান’ আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বেদনাদায়ক অধ্যায়। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী অস্থিরতা জার্মানিকে এক স্বৈরাচারী শাসনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল এবং কীভাবে অ্যাডলফ হিটলারের মতো এক নেতার উদয় হয়েছিল।

বিষয়ের ভূমিকা

এই অধ্যায়টি শুরু হয় হেলমুট নামে এক ছোট্ট বালকের কাহিনী দিয়ে, যার বাবা নাৎসি শাসনের একজন সমর্থক ছিলেন এবং যুদ্ধের শেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। এই ঘটনাটি নাৎসি জার্মানির ভয়াবহতা এবং তার পরিণতির এক ক্ষুদ্র প্রতিফলন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয় এবং তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া অপমানজনক ‘ভার্সাই চুক্তি’ (Treaty of Versailles) জার্মানির জনমনে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দেয়। এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়েই নাৎসি দল এবং অ্যাডলফ হিটলার ক্ষমতায় আসেন। নাৎসিবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল না, এটি ছিল ঘৃণা, বর্ণবাদ এবং চরম জাতীয়তাবাদের এক ভয়ংকর মিশ্রণ।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

নাৎসিবাদ এবং হিটলারের উত্থানকে বুঝতে হলে আমাদের কয়েকটি প্রধান স্তরে আলোচনা করতে হবে:

১. ভাইমার প্রজাতন্ত্রের জন্ম ও তার সংকট

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮) জার্মানি পরাজিত হওয়ার পর সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়াম সিংহাসন ত্যাগ করেন। এর ফলে জার্মানির রাজনৈতিক কাঠামোতে একটি শূন্যস্থান তৈরি হয় এবং ‘ভাইমার’ নামক স্থানে একটি জাতীয় পরিষদ গঠিত হয়। এর মাধ্যমে জার্মানিতে একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ভাইমার প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত।

  • ভার্সাই চুক্তি: এই নতুন প্রজাতন্ত্রকে মিত্রশক্তির সাথে এক অত্যন্ত কঠোর ও অপমানজনক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হয়। এই চুক্তির ফলে জার্মানি তার খনিজ সমৃদ্ধ এলাকা, উপনিবেশ এবং সেনাশক্তি হারায়। জার্মানিকে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ৬ বিলিয়ন পাউন্ড জরিমানা দিতে বাধ্য করা হয়।
  • নভেম্বর ক্রিমিনালস: সাধারণ জার্মান নাগরিকরা ভাইমার প্রজাতন্ত্রকে এই অপমানের জন্য দায়ী মনে করত। যারা এই প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন করত, তাদের বিদ্রূপ করে ‘নভেম্বর ক্রিমিনালস’ বলা হতো।

২. অর্থনৈতিক সংকট এবং অতি-মুদ্রাস্ফীতি (Hyperinflation)

যুদ্ধের খরচ মেটাতে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে জার্মানির অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। ১৯২৩ সালে জার্মানি ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করলে ফ্রান্স তাদের প্রধান শিল্পাঞ্চল ‘রুর’ (Ruhr) দখল করে নেয়। এর প্রতিবাদে জার্মানি প্রচুর পরিমাণে কাগজের মুদ্রা ছাপতে শুরু করে।

  • এর ফলে জার্মান মুদ্রার (মার্ক) মান মারাত্মকভাবে পড়ে যায়। পরিস্থিতির এমন অবনতি হয় যে, এক টুকরো রুটি কিনতে এক গাড়ি টাকা নিয়ে যেতে হতো। এই অবস্থাকেই বলা হয় অতি-মুদ্রাস্ফীতি
  • ১৯২৯ সালে আমেরিকার শেয়ার বাজার (Wall Street Exchange) ধসে পড়লে বিশ্বজুড়ে মন্দা দেখা দেয়, যা জার্মানিকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে যায়। বেকারত্ব ৪০ লক্ষ থেকে বেড়ে ৬০ লক্ষে পৌঁছায়।

৩. হিটলারের ক্ষমতায় আরোহণ

হিটলার ছিলেন একজন অসাধারণ বাগ্মী। তার শক্তিশালী বক্তৃতা জনগণকে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাত। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি ভার্সাই চুক্তির অবিচারের প্রতিশোধ নেবেন এবং জার্মানির হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনবেন।

  • ১৯১৯ সালে তিনি একটি ছোট দলে যোগ দেন যা পরে National Socialist German Workers' Party বা নাৎসি দল নামে পরিচিত হয়।
  • ১৯৩২ সালের নির্বাচনে নাৎসি দল জার্মানির বৃহত্তম দলে পরিণত হয় (৩৭% ভোট)। ১৯৩৩ সালের ৩০শে জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ হিটলারকে চ্যান্সেলর পদের প্রস্তাব দেন।

৪. গণতন্ত্রের বিনাশ ও স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

ক্ষমতায় আসার পর হিটলার দ্রুত গণতান্ত্রিক কাঠামোগুলো ধ্বংস করতে শুরু করেন।

  • ফায়ার ডিক্রি (Fire Decree): ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মান পার্লামেন্টে (রাইখস্ট্যাগ) একটি রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডের পর নাগরিক অধিকার স্থগিত করা হয়।
  • এনাবলিং অ্যাক্ট (Enabling Act): ১৯৩৩ সালের ৩রা মার্চ এই আইন পাসের মাধ্যমে হিটলারকে ডিক্রির মাধ্যমে শাসন করার একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়। রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ করা হয়।
  • গ্যেস্টাপো (Gestapo): হিটলার তার বিরোধীদের দমনের জন্য একটি শক্তিশালী গোপন পুলিশ বাহিনী তৈরি করেন।

৫. নাৎসি বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি ও জাতিবিদ্বেষ

নাৎসিবাদের মূল ভিত্তি ছিল ডারউইন ও হার্বার্ট স্পেন্সারের তত্ত্বের অপব্যাখ্যা। হিটলার বিশ্বাস করতেন যে মানুষের মধ্যে উচ্চ-নীচ স্তর রয়েছে।

  • আর্য শ্রেষ্ঠত্ব: তাদের মতে ব্লন্ড (সোনালী চুল), নীল চোখের ‘নর্ডিক আর্যরা’ ছিল শ্রেষ্ঠ জাতি এবং ইহুদিরা ছিল সর্বনিম্ন স্তরে।
  • লেবেনস্রাউম (Lebensraum): হিটলারের লক্ষ্য ছিল নতুন নতুন এলাকা দখল করে জার্মান জাতির বসবাসের জন্য জায়গা (Living Space) বাড়ানো।
  • হলোকাস্ট (Holocaust): নাৎসিরা ইহুদি, জিপসি এবং পোলিশদের ‘অবাঞ্ছিত’ বলে ঘোষণা করে। গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হয়, যা ইতিহাসে হলোকাস্ট নামে পরিচিত।

৬. নাৎসি জার্মানিতে তরুণ ও নারী

হিটলার বিশ্বাস করতেন একটি শক্তিশালী নাৎসি সমাজ গড়তে হলে শৈশব থেকেই নাৎসি মতাদর্শ গেঁথে দিতে হবে।

  • স্কুল পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করা হয়। দশ বছর বয়সী ছেলেদের ‘জুংভোক’ (Jungvolk) এবং পরে ‘হিটলার ইয়ুথ’-এ যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল।
  • নারীদের আদর্শ গৃহিণী এবং বিশুদ্ধ আর্য সন্তানের জননী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যারা বেশি সন্তান জন্ম দিত, তাদের ‘অনার ক্রস’ পদক দিয়ে সম্মানিত করা হতো।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

১. ভার্সাই চুক্তির শর্তগুলো কেন জার্মানির জন্য অপমানজনক ছিল?
উত্তর: ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানি তার ১৩% ভূখণ্ড, ৭৫% লৌহ খনি এবং ২৬% কয়লা খনি হারায়। তাদের সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়া হয় এবং যুদ্ধের দায়ভার চাপিয়ে বিশাল অংকের জরিমানা করা হয়, যা জার্মানির মর্যাদা ও অর্থনীতি দুইই ধ্বংস করে দেয়।

২. নাৎসি প্রোপাগান্ডা বা প্রচার কৌশল কেমন ছিল?
উত্তর: নাৎসিরা মিডিয়াকে খুব সুকৌশলে ব্যবহার করত। তারা হত্যার বদলে ‘বিশেষ ব্যবস্থা’ বা ‘উদ্বাসন’ (Evacuation) এর মতো শব্দ ব্যবহার করত। চলচ্চিত্র, রেডিও এবং পোস্টারের মাধ্যমে ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো হতো এবং হিটলারকে ত্রাণকর্তা হিসেবে তুলে ধরা হতো।

৩. ভাইমার প্রজাতন্ত্র কেন জনপ্রিয় হতে পারেনি?
উত্তর: ভাইমার প্রজাতন্ত্র শুরু থেকেই ভার্সাই চুক্তির অপমানজনক শর্তগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এছাড়া মুদ্রাস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়ায় সাধারণ মানুষ তাদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল।

সারসংক্ষেপ

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট হিটলারের উত্থানের পথ প্রশস্ত করে।
  • নাৎসিবাদ আর্য শ্রেষ্ঠত্ব ও ইহুদি বিদ্বেষের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।
  • হিটলার গণতন্ত্র ধ্বংস করে ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।
  • নাৎসিদের চরম বর্ণবিদ্বেষের ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ভয়াবহ হলোকাস্ট সংঘটিত হয়।
  • ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের শেখায় যে চরমপন্থী মতাদর্শ এবং ঘৃণার রাজনীতি মানবজাতির জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে।