বিষয়ের ভূমিকা
হরপ্পা সভ্যতার পতনের পর ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় পরে আবার এক নতুন পরিবর্তনের সূচনা হয়। প্রায় ১৫০০ বছরের ব্যবধানে সিন্ধু নদের অববাহিকায় ঋগ্বেদ সংকলিত হয়। এই সময় থেকেই উত্তর ভারত, দক্ষিণ ভারত এবং দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে কৃষিভিত্তিক সমাজ ও পশুপালনের প্রসারের চিহ্ন পাওয়া যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী (6th Century BCE) ভারতের ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলবিভাজিকা বা 'টার্নিং পয়েন্ট' হিসেবে পরিচিত। এই সময়েই ভারতে প্রথম বড় আকারের রাজ্য, শহর এবং লোহার ব্যবহারের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। NCERT-এর এই অধ্যায়টিতে আমরা আলোচনা করব কীভাবে প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল এবং সেই সময়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র কেমন ছিল।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী: একটি যুগান্তকারী সময়
ইতিহাসবিদরা কেন খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখেন? এর প্রধান কারণগুলি হলো:
- লোহার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার: কৃষিকাজে লোহার লাঙ্গলের ব্যবহার এবং যুদ্ধে লোহার অস্ত্রের ব্যবহার বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
- মুদ্রার প্রচলন: ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে মুদ্রার (যেমন- পাঞ্চ মার্কড কয়েন) ব্যবহার শুরু হয়।
- বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম: এই সময়েই নতুন নতুন ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাধারার জন্ম হয়।
- মহাজনপদের উত্থান: জনপদ থেকে ধীরে ধীরে শক্তিশালী ১৬টি মহাজনপদের সৃষ্টি হয়।
২. ষোড়শ মহাজনপদ এবং মগধের আধিপত্য
বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থগুলোতে ১৬টি বড় রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ আছে, যেগুলোকে 'মহাজনপদ' বলা হয়। এগুলোর মধ্যে মগধ, কোশল, কুরু, পাঞ্চাল, গান্ধার এবং অবন্তী ছিল প্রধান। অধিকাংশ মহাজনপদ রাজারা শাসন করতেন, কিন্তু কিছু ছিল 'গণ' বা 'সংঘ' (যেমন- বৃজি), যেখানে ক্ষমতা অনেকের মধ্যে ভাগ করা থাকত।
মগধ কেন সবচেয়ে শক্তিশালী হয়েছিল?
- ভৌগোলিক অবস্থান: মগধ (বর্তমান বিহার) ছিল অত্যন্ত উর্বর জমি, যেখানে প্রচুর শস্য উৎপন্ন হতো।
- লোহার খনি: ঝাড়খণ্ডের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ার ফলে মগধ সহজেই উন্নত অস্ত্র তৈরির জন্য লোহা পেত।
- প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা: রাজগৃহ (পুরানো রাজধানী) পাহাড় দিয়ে ঘেরা ছিল এবং পাটলিপুত্র গঙ্গা ও সোন নদীর সংগমে অবস্থিত হওয়ায় জলপথে যাতায়াত ও নিরাপত্তা সহজ ছিল।
- হাতির ব্যবহার: মগধের সেনাবাহিনীতে বন্য হাতি ব্যবহার করা হতো, যা যুদ্ধে এক বিশাল শক্তি হিসেবে কাজ করত।
- যোগ্য শাসক: বিম্বিসার, অজাতশত্রু এবং মহাপদ্ম নন্দের মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজাদের নীতি মগধকে শ্রেষ্ঠ করে তুলেছিল।
৩. মৌর্য সাম্রাজ্য: ভারতের প্রথম বড় সাম্রাজ্য
মগধের উত্থানের চূড়ান্ত পর্যায় ছিল মৌর্য সাম্রাজ্য। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২১ অব্দ) এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। মৌর্যদের ইতিহাস জানার জন্য আমাদের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উৎস আছে:
- মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা': গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস পাটলিপুত্রের প্রশাসন ও সমাজ নিয়ে লিখেছেন।
- কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র': রাজনীতি ও অর্থনীতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেয়।
- অশোকের শিলালিপি: ভারতের প্রাচীনতম পাঠোদ্ধারকৃত লিপি, যার মাধ্যমে সম্রাট অশোক তাঁর প্রজাদের সাথে যোগাযোগ করতেন।
অশোকের 'ধম্ম': কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে অশোক যুদ্ধ ত্যাগ করেন এবং 'ধম্ম' প্রচার শুরু করেন। তাঁর ধম্ম কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম ছিল না, বরং এটি ছিল কিছু নৈতিক মূল্যবোধ: বড়দের সম্মান করা, দাসদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা এবং অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল হওয়া।
৪. দক্ষিণ ভারতের রাজবংশ এবং ঐশ্বরিক রাজতন্ত্র
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতের বিভিন্ন অংশে নতুন রাজবংশের উত্থান ঘটে। দাক্ষিণাত্যে চোল, চের ও পাণ্ড্য রাজবংশগুলো প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এই সময়ের রাজারা নিজেদের ক্ষমতার বৈধতা প্রমাণের জন্য নিজেদের 'দেবপুত্র' বা দেবতাদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রচার করতেন। কুশান রাজারা প্রথম বড় বড় মূর্তি তৈরি করে এবং মুদ্রায় নিজেদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে এই 'ডিভাইন কিংশিপ' বা ঐশ্বরিক রাজতন্ত্রের ধারণা চালু করেন।
৫. কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজ
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষির উৎপাদন বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছিল। এর জন্য দুটি প্রধান পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল:
- লোহার ফালযুক্ত লাঙ্গল: গঙ্গা ও কাবেরী উপত্যকার উর্বর জমিতে এটি ব্যবহৃত হতো।
- ধান রোপণ পদ্ধতি: এর ফলে ফলন অনেক বেড়ে যায়।
- সেচ ব্যবস্থা: রাজা ও ধনী ব্যক্তিরা কুয়ো, পুকুর এবং খালের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থার উন্নতি করেন।
তবে কৃষি উন্নতির সুফল সবাই সমানভাবে পায়নি। গ্রামীণ সমাজে বিভেদ ছিল। বৌদ্ধ গ্রন্থগুলোতে ভূমিহীন চাষী, ছোট কৃষক এবং বড় জমিদারদের (যাদের তামিল ভাষায় 'ভেল্লার' বলা হতো) উল্লেখ পাওয়া যায়।
৬. নগর ও বাণিজ্য
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে অনেক নতুন শহরের বিকাশ ঘটে। যেমন পাটলিপুত্র, উজ্জয়িনী এবং পুহার। এই শহরগুলিতে কারিগর ও বণিকরা 'শ্রেণি' (Guilds) গঠন করত। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পাশাপাশি রোমান সাম্রাজ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সমুদ্রপথে বাণিজ্য চলত। মসলা, কাপড় ও দামী পাথরের প্রচুর চাহিদা ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে।
৭. লিপির পাঠোদ্ধার: জেমস প্রিন্সেপ এবং ব্রাহ্মী লিপি
১৮৩০-এর দশকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা জেমস প্রিন্সেপ অশোকের শিলালিপিতে ব্যবহৃত ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপির পাঠোদ্ধার করেন। এটি ভারতীয় ইতিহাস চর্চায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এর মাধ্যমেই আমরা সম্রাট অশোকের নাম (পিয়দসি বা প্রিয়দর্শী) এবং তাঁর প্রশাসনিক সংস্কার সম্পর্কে জানতে পারি।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. মগধের রাজধানী কোথায় ছিল?
উত্তর: মগধের প্রথম রাজধানী ছিল রাজগৃহ (বর্তমান রাজগির), যা পাহাড় দিয়ে ঘেরা ছিল। পরবর্তীতে সম্রাটরা রাজধানী গঙ্গা নদীর তীরে পাটলিপুত্রে (বর্তমান পাটনা) স্থানান্তরিত করেন।
২. ব্রাহ্মী লিপির গুরুত্ব কী?
উত্তর: ব্রাহ্মী লিপি হলো ভারতের অধিকাংশ আধুনিক লিপির (যেমন- দেবনাগরী, বাংলা) জননী। অশোকের শিলালিপিগুলি মূলত এই লিপিতেই লেখা ছিল, যা প্রাচীন ভারতের ইতিহাস জানার প্রধান উৎস।
৩. মৌর্য প্রশাসনে কয়টি প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল?
উত্তর: মৌর্য সাম্রাজ্যে পাঁচটি প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল—রাজধানী পাটলিপুত্র এবং চারটি প্রাদেশিক কেন্দ্র: তক্ষশিলা, উজ্জয়িনী, তোসালি এবং সুবর্ণগিরি।
সারসংক্ষেপ
- খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী ছিল ভারতের দ্বিতীয় নগরীকরণের সময়।
- ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে মগধ সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
- মৌর্য সাম্রাজ্য প্রথমবার ভারতের একটি বিশাল অংশকে একক শাসনের অধীনে আনে।
- কৃষিতে লোহার ব্যবহার এবং বাণিজ্যে মুদ্রার প্রচলন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছিল।
- অশোকের শিলালিপি এবং মেগাস্থিনিসের বর্ণনা এই যুগের ইতিহাস জানার সেরা উপাদান।
- প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবর্তন আজকের ভারতের বুনিয়াদ তৈরিতে সাহায্য করেছে।