বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের চারপাশের পরিবেশে যা কিছু আমাদের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম, যা ব্যবহার করার প্রযুক্তি আমাদের হাতে আছে, যা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং যা সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য—তাই হলো সম্পদ (Resource)। দশম শ্রেণির ভূগোলের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় 'সম্পদ ও উন্নয়ন'-এ আমরা জানব কীভাবে সম্পদ আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে এবং কেন এই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও পরিকল্পনা আমাদের পৃথিবীর ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। সম্পদ কোনো ঈশ্বরের অলৌকিক দান নয়, বরং এটি মানুষের কার্যাবলীর একটি ফল। মানুষ নিজেই সম্পদের একটি প্রধান উপাদান, কারণ তারা পরিবেশের বিভিন্ন বস্তুকে সম্পদে রূপান্তর করে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. সম্পদের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Resources)
সম্পদকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করা যায়। নিচে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
- উৎপত্তি অনুসারে:
- জৈব সম্পদ (Biotic Resources): এই সম্পদগুলো জীবমণ্ডল থেকে পাওয়া যায় এবং এদের জীবন আছে। যেমন—মানুষ, উদ্ভিদ, প্রাণী, মৎস্য সম্পদ ইত্যাদি।
- অজৈব সম্পদ (Abiotic Resources): যে সমস্ত সম্পদ নির্জীব বস্তু দিয়ে গঠিত। যেমন—শিলা, ধাতু, খনিজ পদার্থ ইত্যাদি।
- স্থায়িত্ব বা ফুরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনুসারে:
- পুনর্নবীকরণযোগ্য সম্পদ (Renewable Resources): যে সম্পদগুলো ব্যবহারের পর আবার প্রাকৃতিকভাবে ফিরে পাওয়া যায়। যেমন—সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলশক্তি এবং বনভূমি।
- অ-পুনর্নবীকরণযোগ্য সম্পদ (Non-renewable Resources): এই সম্পদগুলো একবার শেষ হয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যায় না বা তৈরি হতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে। যেমন—কয়লা, পেট্রোলিয়াম এবং অন্যান্য খনিজ।
- মালিকানা অনুসারে:
- ব্যক্তিগত সম্পদ: কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির অধীনে থাকা সম্পদ (যেমন—নিজের বাড়ি বা চাষের জমি)।
- গোষ্ঠীগত সম্পদ: সমাজের সকলে যা ব্যবহার করতে পারে (যেমন—খেলার মাঠ, শ্মশান, পার্ক)।
- জাতীয় সম্পদ: দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে থাকা সমস্ত সম্পদ এবং উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্রের জলভাগ ও খনিজ।
- আন্তর্জাতিক সম্পদ: সমুদ্রের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরের অংশ যা কোনো দেশ একতরফাভাবে ব্যবহার করতে পারে না।
- উন্নয়নের পর্যায় অনুসারে:
- সম্ভাব্য সম্পদ (Potential Resources): যে সম্পদ ব্যবহার করার ক্ষমতা আমাদের আছে কিন্তু বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে না (যেমন—রাজস্থান ও গুজরাটের বায়ুশক্তি)।
- ভাণ্ডার (Stock): পরিবেশে উপস্থিত কিন্তু সঠিক প্রযুক্তির অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না (যেমন—জল থেকে হাইড্রোজেন নিষ্কাশন)।
২. সম্পদের উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development)
মানুষ নির্বিচারে সম্পদ ব্যবহার করার ফলে অনেক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যেমন—সম্পদ শেষ হয়ে যাওয়া, গুটিকয়েক মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া (গ্লোবাল ওয়ার্মিং, ওজোন স্তর ক্ষয়)।
টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development): এর অর্থ হলো এমনভাবে উন্নয়ন করা যাতে পরিবেশের ক্ষতি না হয় এবং বর্তমানের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রজন্মের চাহিদার সঙ্গে কোনো আপস করা না হয়। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে 'বসুন্ধরা সম্মেলন' (Earth Summit) অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে 'এজেন্ডা ২১' (Agenda 21) গ্রহণ করা হয় বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়নের জন্য।
৩. সম্পদ পরিকল্পনা (Resource Planning)
ভারতের মতো বিশাল দেশে সম্পদ পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি কারণ এখানে সম্পদের বণ্টন অত্যন্ত অসম। যেমন—ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড়ে প্রচুর খনিজ থাকলেও পরিকাঠামো কম, আবার অরুণাচল প্রদেশে প্রচুর জল থাকলেও পরিকাঠামো নেই। সম্পদ পরিকল্পনার তিনটি প্রধান ধাপ হলো:
- দেশজুড়ে সম্পদ চিহ্নিত করা এবং তালিকা তৈরি করা।
- উপযুক্ত প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিকল্পনা তৈরি করা।
- জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সম্পদ পরিকল্পনার সমন্বয় সাধন।
৪. মৃত্তিকা সম্পদ ও তার শ্রেণিবিভাগ (Soil as a Resource)
মাটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুনর্নবীকরণযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। ভারতে বিভিন্ন ধরনের মাটি দেখা যায়:
- পলি মাটি (Alluvial Soil): ভারতের সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র সমভূমি অঞ্চলে এটি দেখা যায়। এটি অত্যন্ত উর্বর এবং ধান, গম, আখ চাষের জন্য সেরা।
- কৃষ্ণ মৃত্তিকা (Black Soil): একে 'রেগুর মৃত্তিকা' বা 'তুলা মাটি'ও বলা হয়। এটি দাক্ষিণাত্যের লাভা গঠিত অঞ্চলে দেখা যায় এবং তুলা চাষের জন্য আদর্শ।
- লোহিত ও হলুদ মৃত্তিকা (Red and Yellow Soil): আগ্নেয় ও রূপান্তরশীল শিলা থেকে এটি তৈরি হয়। লোহার উপস্থিতির কারণে এর রঙ লাল হয়।
- ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা (Laterite Soil): অধিক বৃষ্টিপাত ও উচ্চ তাপমাত্রাযুক্ত অঞ্চলে দেখা যায়। এতে হিউমাসের পরিমাণ কম থাকে। তবে সার প্রয়োগ করে চা ও কফি চাষ করা যায়।
- মরু মৃত্তিকা (Arid Soil): এটি বালিযুক্ত এবং নোনতা। রাজস্থানের মতো শুষ্ক অঞ্চলে এটি দেখা যায়।
৫. ভূমি ক্ষয় ও সংরক্ষণ (Land Degradation and Conservation)
বন নিধন, অতি-পশুচারণ, খনন কার্য এবং জমিতে অত্যাধিক সেচ দেওয়ার ফলে জমির গুণমান নষ্ট হয়। একেই ভূমি ক্ষয় বলে। এর প্রতিকার হলো—বেশি করে গাছ লাগানো (Afforestation), পশুচারণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং মরুভূমি এলাকায় কাঁটাঝোপ লাগানো।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. সম্পদ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: পরিবেশের যা কিছু আমাদের অভাব পূরণ করে এবং যা প্রযুক্তিনির্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, তাকেই সম্পদ বলে।
২. 'খাদার' (Khadar) ও 'ভাঙর' (Bangar)-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: খাদার হলো নতুন পলি মাটি যা নদীর কাছে থাকে এবং খুব উর্বর। অন্যদিকে, ভাঙর হলো পুরোনো পলি মাটি যা নদীর থেকে দূরে থাকে এবং এতে চুনজাতীয় নুড়ির (Kankar) আধিক্য থাকে।
৩. গান্ধীজির মতে সম্পদের সংরক্ষণের গুরুত্ব কী?
উত্তর: মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, "সবার প্রয়োজনে পৃথিবী যথেষ্ট সম্পদ দিতে পারে, কিন্তু কারো লোভ মেটানোর জন্য নয়।" তিনি সম্পদের অপচয় এবং প্রযুক্তির যান্ত্রিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে ছিলেন।
সারসংক্ষেপ
- সম্পদ কোনো স্থবির বস্তু নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া।
- টেকসই উন্নয়ন হলো আগামীর জন্য সম্পদ বাঁচিয়ে রেখে বর্তমানের কাজ চালানো।
- ভারত খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও তার সঠিক বন্টন ও পরিকল্পনার প্রয়োজন আছে।
- মাটি হলো জীবমন্ডলের প্রধান আধার, তাই মৃত্তিকা সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।