বিষয়ের ভূমিকা
ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব একটি সাধারণ ঘটনা নয়; এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের ফলাফল। দশম শ্রেণির ইতিহাসের এই অধ্যায়টি আমাদের দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। আধুনিক জাতীয়তাবাদ বলতে সাধারণত একটি জাতির প্রতি একাত্মবোধ এবং দেশপ্রেমকে বোঝায়। ভারতবর্ষে এই একাত্মবোধ গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের হাত ধরে। এই অধ্যায়ে আমরা মূলত ১৯২০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া বিভিন্ন গণআন্দোলন যেমন—অসহযোগ আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন এবং আইন অমান্য আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কীভাবে সাধারণ মানুষ একটি অভিন্ন লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হয়েছিল, তা জানাই এই পাঠের মূল উদ্দেশ্য।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারতের পরিস্থিতি
১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। যুদ্ধের ব্যয় মেটানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার ভারতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করে। এর ফলে ভারতবাসীকে নিম্নলিখিত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়:
- কর বৃদ্ধি: যুদ্ধের ঘাটতি পূরণের জন্য কাস্টমস ডিউটি বাড়ানো হয় এবং আয়কর (Income Tax) চালু করা হয়।
- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি: ১৯১৩ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়, যার ফলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে।
- জোরপূর্বক নিয়োগ: গ্রামাঞ্চল থেকে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে লোক নিয়োগ করা হয়, যা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
- দুর্ভিক্ষ ও মহামারী: ১৯১৮-১৯ এবং ১৯২০-২১ সালে ফসল নষ্ট হওয়ার ফলে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয় এবং সেই সময় ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীতে প্রায় ১২০ থেকে ১৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান।
২. মহাত্মা গান্ধী এবং সত্যাগ্রহের আদর্শ
১৯১৫ সালের জানুয়ারি মাসে মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে আসেন। তিনি সেখানে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে এক অভিনব অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে জয়ী হয়েছিলেন, যার নাম ছিল 'সত্যগ্রহ'।
সত্যাগ্রহ কী? সত্যাগ্রহের মূল কথা হলো সত্যের শক্তি এবং সত্যের অনুসন্ধান। গান্ধীজি বিশ্বাস করতেন যে, যদি উদ্দেশ্য সঠিক হয় এবং অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়, তবে শারীরিক বলের কোনো প্রয়োজন নেই। প্রতিহিংসা ছাড়াই একজন সত্যাগ্রহী সত্যের মাধ্যমে অন্যায়কারীর বিবেককে জাগ্রত করতে পারেন।
ভারতে গান্ধীজির প্রাথমিক আন্দোলনসমূহ:
- চম্পারণ (১৯১৬): বিহারের চম্পারণে নীল চাষিদের ওপর অত্যাচার বন্ধের জন্য আন্দোলন।
- খেদা (১৯১৭): গুজরাটের খেদা জেলার কৃষকদের শস্য নষ্ট হওয়ায় খাজনা মকুবের দাবিতে আন্দোলন।
- আহমেদাবাদ (১৯১৮): সুতি বস্ত্র কারখানার শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সত্যাগ্রহ।
৩. রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড
১৯১৯ সালে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল তড়িঘড়ি করে 'রাওলাট আইন' পাস করে। এই আইনের মাধ্যমে সরকারকে বিনা বিচারে রাজনৈতিক বন্দিদের দুই বছর পর্যন্ত আটকে রাখার ক্ষমতা দেওয়া হয়। গান্ধীজি এর প্রতিবাদে ৬ই এপ্রিল হরতালের ডাক দেন।
জালিয়ানওয়ালা বাগ: ১৩ই এপ্রিল ১৯১৯ সালে অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালা বাগে এক শান্তিপূর্ণ সভায় জেনারেল ডায়ার অতর্কিতে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। এতে শত শত সাধারণ মানুষ নিহত হন। ডায়ারের উদ্দেশ্য ছিল ভারতবাসীর মনে ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করা। এই ঘটনার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'নাইটহুড' উপাধি ত্যাগ করেন।
৪. অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন
গান্ধীজি বুঝতে পেরেছিলেন যে, হিন্দু ও মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ না করলে বড় কোনো আন্দোলন সম্ভব নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয়ের পর খলিফার ক্ষমতা খর্ব করা হলে ভারতীয় মুসলিমরা ক্ষুব্ধ হন। মুহাম্মদ আলী এবং শওকত আলী (আলী ভ্রাতৃদ্বয়) গান্ধীজির সাথে খিলাফত আন্দোলনে যোগ দেন।
১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি গৃহীত হয়। গান্ধীজির লেখা 'হিন্দ স্বরাজ' (১৯০৯) বইটিতে তিনি বলেছিলেন যে, ব্রিটিশরা ভারতে টিকে আছে কারণ ভারতীয়রাই তাদের সহযোগিতা করে। যদি ভারতবাসী সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়, তবে এক বছরের মধ্যেই স্বরাজ আসবে।
৫. আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা
অসহযোগ আন্দোলন সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল:
- শহর এলাকা: মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ আন্দোলনে যোগ দেয়। হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্কুল-কলেজ ত্যাগ করে, শিক্ষকরা পদত্যাগ করেন এবং আইনজীবীরা আদালত বর্জন করেন। বিদেশি পণ্য পোড়ানো হয় এবং লিকার শপগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।
- গ্রামাঞ্চল: অযোধ্যায় বাবা রামচন্দ্রের নেতৃত্বে কৃষকরা জমিদারদের উচ্চ খাজনা ও 'বেগার' (বিনা পরিশ্রমে কাজ) প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন।
- উপজাতি এলাকা: অন্ধ্রপ্রদেশের গুডেম হিলসে অল্লুরি সীতারাম রাজুর নেতৃত্বে আদিবাসীরা বন আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে বিদ্রোহ শুরু করে।
- চা বাগান: আসামের বাগান শ্রমিকরা 'গান্ধী রাজ' আসছে ভেবে বাগান ছেড়ে বাড়ির পথে রওনা হন।
৬. আইন অমান্য আন্দোলনের পথে
১৯২২ সালে উত্তরপ্রদেশের চৌরি চৌরা নামক স্থানে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল সহিংস রূপ নিলে গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। এরপর ১৯২৯ সালে লাহোর অধিবেশনে জওহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে 'পূর্ণ স্বরাজ' বা সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করা হয়।
১৯৩০ সালের ১২ই মার্চ গান্ধীজি তাঁর ৭৪ জন অনুগামী নিয়ে সবরমতী আশ্রম থেকে ডান্ডি অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। এটিই ছিল বিখ্যাত 'লবণ পদযাত্রা' বা ডান্ডি মার্চ। ৬ই এপ্রিল তিনি সমুদ্রের জল ফুটিয়ে লবণ তৈরির মাধ্যমে ব্রিটিশদের লবণ আইন ভঙ্গ করেন। শুরু হয় 'আইন অমান্য আন্দোলন' (Civil Disobedience Movement)।
৭. সামষ্টিক একাত্মবোধের সৃষ্টি
জাতীয়তাবাদ কেবল যুদ্ধের মাধ্যমে আসে না, এটি আসে ইতিহাসের অংশীদারিত্ব, লোকগাথা, এবং প্রতীকের মাধ্যমে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ভারতমাতা'র চিত্র অঙ্কন করেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বন্দে মাতরম' গানটি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রধান শ্লোগান হয়ে ওঠে। তেরঙা জাতীয় পতাকার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের সঞ্চার করা হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মূল ভিত্তি কী ছিল?
উত্তর: সত্যাগ্রহের মূল ভিত্তি ছিল সত্যের শক্তি এবং অহিংসার পথ। এটি বিশ্বাস করে যে, সত্যের জয়ের জন্য শারীরিক বল বা পাশবিক শক্তির প্রয়োজন নেই।
২. কেন গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেছিলেন?
উত্তর: ১৯২২ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের চৌরি চৌরায় আন্দোলনকারীরা একটি থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়, যেখানে ২২ জন পুলিশকর্মী নিহত হন। আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠায় গান্ধীজি অহিংসার আদর্শ রক্ষার্থে আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।
৩. জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের গুরুত্ব কী?
উত্তর: এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ভারতবাসীর ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। এটি ভারতের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে একটি নতুন মোড় দিয়েছিল এবং গান্ধীজিকে বড় ধরণের অসহযোগ আন্দোলনের পথে চালিত করেছিল।
সারসংক্ষেপ
- ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতার মাধ্যমে।
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ভারতের অর্থনীতি ও জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছিল।
- গান্ধীজি সত্যাগ্রহের মাধ্যমে গণআন্দোলনের এক নতুন দিক উন্মোচন করেন।
- অসহযোগ এবং আইন অমান্য আন্দোলন ছিল ভারতীয় ইতিহাসের দুটি প্রধান স্তম্ভ।
- খিলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক ফুটে ওঠে।
- জাতীয়তাবাদী প্রতীক, লোকসংগীত এবং ইতিহাস পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে ভারতবাসীর মধ্যে একাত্মবোধ তৈরি হয়েছিল।