বিষয়ের ভূমিকা

জীব জগতের অস্তিত্ব রক্ষায় খাদ্যের ভূমিকা অপরিসীম। আমরা জানি যে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ হলো খাদ্যের প্রধান উপাদান, যাদের একত্রে আমরা 'পুষ্টি উপাদান' বা Nutrients বলি। আমাদের শরীরের গঠন, বৃদ্ধি এবং ক্ষত নিরাময়ের জন্য এই উপাদানগুলি একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন, গাছপালা তাদের খাবার কোথা থেকে পায়? মানুষের মতো তারা তো আর রান্নাঘরে গিয়ে খাবার তৈরি করে না। সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞানের প্রথম অধ্যায় 'উদ্ভিদের পুষ্টি'-তে আমরা এই রহস্যেরই উন্মোচন করব। এই অধ্যায়টি আমাদের জানাবে কীভাবে উদ্ভিদ সূর্যের আলো ব্যবহার করে নিজেদের খাবার নিজেরা তৈরি করে এবং কীভাবে কিছু উদ্ভিদ অন্যদের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

উদ্ভিদের পুষ্টি প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। নীচে এই প্রক্রিয়ার মূল দিকগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. পুষ্টির প্রকারভেদ: স্বভোজী ও পরভোজী

পুষ্টি গ্রহণের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে উদ্ভিদকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  • স্বভোজী পুষ্টি (Autotrophic Nutrition): যে পদ্ধতিতে জীব নিজের খাদ্য নিজেই তৈরি করতে পারে, তাকে স্বভোজী পুষ্টি বলে। সবুজ উদ্ভিদরা এই গোত্রভুক্ত। তারা জল, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং খনিজ ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে।
  • পরভোজী পুষ্টি (Heterotrophic Nutrition): যে সমস্ত উদ্ভিদ বা প্রাণী নিজের খাবার নিজে তৈরি করতে পারে না এবং খাদ্যের জন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে, তাদের পরভোজী বলা হয়। যেমন—মানুষ, প্রাণী এবং কিছু বিশেষ ধরণের উদ্ভিদ।

২. সালোকসংশ্লেষ: উদ্ভিদের খাদ্য তৈরির কারখানা

সালোকসংশ্লেষ বা Photosynthesis হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সবুজ উদ্ভিদ সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে ক্লোরোফিলের সাহায্যে জল ও কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করে।

  • ক্লোরোফিল (Chlorophyll): পাতার সবুজ অংশে থাকা এই রঞ্জক পদার্থ সূর্যের শক্তিকে শোষণ করতে সাহায্য করে।
  • পত্ররন্ধ্র (Stomata): পাতার গায়ে থাকা ছোট ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড গৃহীত হয়। এই ছিদ্রগুলি রক্ষীকোষ (Guard cells) দ্বারা ঘেরা থাকে।
  • জল ও খনিজ পদার্থ: উদ্ভিদের মূল মাটির নিচ থেকে জল ও খনিজ শোষণ করে তা কাণ্ড ও নালিকার মাধ্যমে পাতায় পৌঁছে দেয়।

বিক্রিয়াটি হলো: কার্বন ডাই অক্সাইড + জল + (সূর্যলোক ও ক্লোরোফিল) = কার্বোহাইড্রেট (শর্করা) + অক্সিজেন। এই প্রক্রিয়াটি কেবল খাদ্য তৈরি করে না, বরং বাতাসে অক্সিজেনের ভারসাম্য বজায় রাখতেও সাহায্য করে।

৩. উদ্ভিদের পুষ্টির অন্যান্য পদ্ধতি

সব উদ্ভিদের ক্লোরোফিল থাকে না, ফলে তারা সালোকসংশ্লেষ করতে পারে না। তারা কীভাবে বেঁচে থাকে? এখানে কিছু বিশেষ পদ্ধতি আলোচনা করা হলো:

  • পরজীবী উদ্ভিদ (Parasitic Plants): স্বর্ণলতা বা কাসকাটা (Cuscuta) এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ। এদের ক্লোরোফিল নেই। এরা অন্য একটি পুষ্টিকর গাছের ওপর জন্মায় এবং সেই গাছ থেকে তৈরি করা পুষ্টি শোষণ করে। যে গাছের ওপর এরা জন্মে থাকে, তাকে 'পোষক' বা Host বলা হয়।
  • পতঙ্গভুক উদ্ভিদ (Insectivorous Plants): কিছু উদ্ভিদ আছে যারা পতঙ্গ শিকার করে তাদের পুষ্টি মেটায়। যেমন—কলসপত্রী উদ্ভিদ (Pitcher Plant)। এই উদ্ভিদগুলি সাধারণত নাইট্রোজেন কম থাকা মাটিতে জন্মায়, তাই শরীরের নাইট্রোজেনের অভাব মেটাতে তারা পতঙ্গ ধরে হজম করে।
  • মৃতজীবী পুষ্টি (Saprotrophic Nutrition): ব্যাঙের ছাতা বা মাশরুম এবং বিভিন্ন ধরণের ছত্রাক এই পদ্ধতিতে পুষ্টি সংগ্রহ করে। তারা মৃত বা পচে যাওয়া জৈব পদার্থের ওপর জন্মায় এবং সেখান থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে।
  • মিথোজীবিতা (Symbiosis): কখনও কখনও দুটি ভিন্ন ধরণের জীব একত্রে বাস করে এবং একে অপরকে খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করে। একে মিথোজীবিতা বলে। যেমন—লাইকেন (Lichen)। এখানে ছত্রাক এবং শৈবাল একত্রে থাকে। শৈবাল খাদ্য তৈরি করে এবং ছত্রাক জল ও আশ্রয় সরবরাহ করে।

৪. মাটিতে পুষ্টির পুনরুদ্ধার

উদ্ভিদ ক্রমাগত মাটি থেকে নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম এবং ফসফরাস শোষণ করতে থাকে। ফলে মাটিতে এই উপাদানগুলির অভাব দেখা দেয়। কৃষকরা এই ঘাটতি মেটাতে জমিতে সার বা Manure ব্যবহার করেন। এছাড়াও রাইজোবিয়াম (Rhizobium) নামক ব্যাকটেরিয়া সিম্বিওটিক বা মিথোজীবী পদ্ধতিতে ডাল জাতীয় শস্যের মূলে বসবাস করে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন নিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়, যা মাটিকে উর্বর করে তোলে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

১. কেন অমরবেল বা স্বর্ণলতাকে পরজীবী বলা হয়?
উত্তর: স্বর্ণলতার নিজস্ব ক্লোরোফিল নেই, তাই সে সালোকসংশ্লেষ করতে পারে না। সে অন্য একটি সজীব গাছের ওপর আরোহণ করে এবং সেই গাছের তৈরি পুষ্টি সরাসরি শোষণ করে বেঁচে থাকে। পোষক গাছের ক্ষতি করে নিজের পুষ্টি সংগ্রহ করে বলেই একে পরজীবী বলা হয়।

২. সালোকসংশ্লেষের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি কী কী?
উত্তর: সালোকসংশ্লেষের জন্য প্রধান চারটি উপাদান হলো—সূর্যালোক, ক্লোরোফিল, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং জল।

৩. পতঙ্গভুক উদ্ভিদ কেন পতঙ্গ খায়?
উত্তর: পতঙ্গভুক উদ্ভিদগুলি সাধারণত এমন মাটিতে জন্মায় যেখানে নাইট্রোজেনের অভাব থাকে। উদ্ভিদের প্রোটিন তৈরির জন্য নাইট্রোজেন খুব জরুরি। এই নাইট্রোজেনের অভাব মেটাতেই তারা পতঙ্গ শিকার করে।

৪. পত্ররন্ধ্র বা স্টোমাটা-র কাজ কী?
উত্তর: পত্ররন্ধ্রের প্রধান কাজ হলো সালোকসংশ্লেষের সময় বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করা এবং অক্সিজেন ত্যাগ করা। এছাড়াও এটি প্রস্বেদন বা বাষ্পমোচনে সাহায্য করে।

সারসংক্ষেপ

  • সবুজ উদ্ভিদরা হলো স্বভোজী, কারণ তারা সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে নিজেদের খাদ্য নিজেরা তৈরি করে।
  • সূর্য হলো সকল শক্তির উৎস।
  • ক্লোরোফিল হলো পাতায় থাকা সবুজ রঞ্জক যা আলোক শক্তি শোষণ করে।
  • ছত্রাক মৃতজীবী হিসেবে পচনশীল পদার্থ থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে।
  • মিথোজীবী সম্পর্কে থাকা জীবেরা একে অপরকে সাহায্য করে।
  • মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে সার এবং রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা অপরিসীম।